যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগে ৫০৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড)। প্রায় ১ হাজার ৬৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ের এ মেগা প্রকল্পে তৈরি হচ্ছে ৪৩৮টি শিল্প প্লট। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাড়ে চার লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে উন্নয়নের এই সম্ভাবনার মধ্যেই জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে স্থানীয় জমির মালিকদের মধ্যে।অভিযোগ উঠেছে, জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রায় তিন বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মালিক। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ জমির মালিক এখনও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছেন। জমির দখল বুঝে নিয়ে প্রকল্পের উন্নয়নকাজ এগিয়ে চললেও অনেক মালিককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে দিনের পর দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরতে হচ্ছে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ যশোর জেলা প্রশাসনকে ২৬৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অধিগ্রহণ করা জমির প্রায় ১ হাজার ৬০০ মালিক ক্ষতিপূরণের আওতায় রয়েছেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পেতে বিলম্বের পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।জমির মালিকদের অভিযোগ, সরকারি হিসাবে জমির যে মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম। ফলে কয়েক বিঘা জমির ক্ষতিপূরণ পেয়েও আশপাশে সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।অভয়নগরের বনগ্রামের মহাসীন আলী, আনোয়ার সরদার, আমিনুল ইসলাম, আজিমুল ইসলাম, কৃপা মালো এবং প্রেমবাগের বাবুল হোসেনসহ কয়েকজন জমির মালিক বলেন, অধিগ্রহণ করা জমির বিপরীতে যে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে আশপাশে এক বিঘা জমিও কেনা সম্ভব হচ্ছে না।তাদের ভাষ্য, ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তাই জমির প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষতিপূরণ পুনর্নির্ধারণ এবং দ্রুত টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন তারা।ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে যে জটিলতাস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী জমির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। গ্রামীণ এলাকায় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ২০০ শতাংশ এবং শহর এলাকায় দ্বিগুণ হারে ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বাসুদেব কুমার মালো বলেন, সংশ্লিষ্ট মৌজায় গত ১২ মাসে নিবন্ধিত জমির দলিলের গড় মূল্যের ভিত্তিতে জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে জমি নিবন্ধনের সময় অনেক মালিক সরকারি কর কমানোর উদ্দেশ্যে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় দলিলে কম দাম উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে ওই দলিলের গড় মূল্য ধরে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করায় তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম হয়ে যায়। ফলে আইন অনুযায়ী তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য থেকে যায়।তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন। বাকিদের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।অর্থনীতিতে বড় সম্ভাবনা যশোর ইপিজেডেরযশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় যশোর ইপিজেড প্রকল্প অনুমোদন পায়। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, পুরোপুরি চালু হয়ে বিনিয়োগকারীদের উৎপাদনে যেতে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সময় লাগতে পারে।প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৩৮টি শিল্প প্লট তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের পাশাপাশি শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগেও শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, যশোর ইপিজেড দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। শিল্পকারখানাগুলোতে সরাসরি কর্মসংস্থান হবে প্রায় দেড় লাখ মানুষের। পাশাপাশি পরিবহন, লজিস্টিকস, আবাসনসহ বিভিন্ন সেবাখাতে আরও প্রায় তিন লাখ মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।যোগাযোগ সুবিধায় এগিয়ে যশোর ইপিজেডপ্রকল্পটির অন্যতম বড় সুবিধা হলো উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থান হওয়ায় সড়কপথে মোংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকবে। ইপিজেড থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার।এ ছাড়া কাছেই রয়েছে চেঙ্গুটিয়া ও নওয়াপাড়া রেলস্টেশন। খুলনা-মোংলা রেলপথ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে রেলপথেও পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।অন্যদিকে পদ্মা সেতুর কারণে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যশোরের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। নড়াইল-ভাঙ্গা হয়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধা কাজে লাগিয়ে রাজধানী এবং দেশের প্রধান বন্দরগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব যোগাযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিতে সময় এবং পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।সব মিলিয়ে যশোর ইপিজেড দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। তবে বড় এই উন্নয়ন প্রকল্পে জমি হারানো মানুষের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত অর্থ পরিশোধ করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।