সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন দেশের অন্তত ৩ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী। প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অনেক শিক্ষকই নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে একদিকে যেমন শিক্ষকরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত পাঠদান।বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় দেশের ৩ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে এর মধ্যে ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।এমন পরিস্থিতিতেই সোমবার (৫ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষকদের পাশে: পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর।’দিবসটি উপলক্ষে জেলা, উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষককে ক্রেস্টের পাশাপাশি ২ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে।শিক্ষক দিবসকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে নন-এমপিও শিক্ষকদের দুরবস্থা। সম্মিলিত নন-এমপিও ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী প্রিন্সিপাল মো. সেলিম মিঞা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।অন্যদিকে বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেনের অভিযোগ, নীতিমালায় পরিবর্তনের কারণে অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরা আবারও এমপিও সুবিধার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তার মতে, শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৩ লাখ বেসরকারি শিক্ষক কর্মরত। তাদের বড় একটি অংশ আর্থিক সংকটে রয়েছেন।এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করতে সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন।শুধু বেসরকারি শিক্ষক নন, সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে বেতন, গ্রেড ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন।সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা বর্তমানে ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। তারা দীর্ঘদিন ধরে ১১তম গ্রেডের দাবি জানিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের দাবিও রয়েছে।প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদের দাবি, শিক্ষক দিবসে সরকার যেন শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়।সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মো. ওমর ফারুক জানান, প্রায় দেড় হাজার সহকারী শিক্ষকের সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতির ফাইল দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে।এ ছাড়া সিনিয়র শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার, প্রধান শিক্ষক ও জেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতিও আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।সরকারি কলেজের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একাংশও সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতিতে বৈষম্যের কারণে পেশা পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করছেন।ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলেন, অন্য পেশার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় শিক্ষকতা অনেকের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় থাকছে না।বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক মহাসচিব মো. শওকত হোসেন মোল্যার অভিযোগ, শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেডের পর্যাপ্ত পদ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বৈষম্য চলছে। একই ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা যেখানে একাধিকবার পদোন্নতি পাচ্ছেন, সেখানে শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা একই পদে বছরের পর বছর আটকে থাকছেন।তবে শিক্ষকদের বঞ্চনার পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু বেসরকারি শিক্ষক নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন না। কেউ কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি বা অন্যান্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। কোথাও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, ন্যায্য বেতন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই শিক্ষক সংকট, বৈষম্য ও মানসম্মত শিক্ষা—তিনটি বিষয়েই কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।