দেশের অর্থনীতিতে একাধিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং ধীরগতিতে চলছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মজুরি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) গত সেপ্টেম্বরের অর্থনৈতিক আপডেট ও আউটলুক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।শুধু আগস্ট মাসে ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। এতে ওই মাসে ঘাটতি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।খাতভিত্তিক হিসাবে, আগস্টে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। আয়কর ও ভ্রমণ কর মিলিয়ে ঘাটতি ৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্কে ঘাটতি ২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।তবে আগের বছরের আগস্টের তুলনায় রাজস্ব আদায় ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ব্যবধান থাকায় সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের গতি কমেছে। উচ্চ ঋণব্যয়, ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরতে সময় লাগা এবং ঋণঝুঁকিকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জিইডি।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।তবে বিনিয়োগের চিত্রে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও রয়েছে। জুলাইয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি আগের মাসের তুলনায় বেড়ে ৩০৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এ বৃদ্ধি সামগ্রিক বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরার নিশ্চিত প্রমাণ নয়।অন্যদিকে, আগস্টে তৈরি পোশাকসহ মোট রপ্তানি আয় আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে আরও তথ্য প্রয়োজন।রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপিতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও এডিপি বাস্তবায়নের হার আগের অর্থবছরের ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমেছে।বিদেশি ঋণ ও অনুদাননির্ভর প্রকল্পে ধীরগতি আরও স্পষ্ট। আগস্টে এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৮৫৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ কম। বিপরীতে সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থ ছাড়ের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রকল্প প্রস্তুতি, দরপত্র, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যাও উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমিয়ে দিতে পারে।অর্থনীতির সামগ্রিক চাপের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। তবে একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।অর্থাৎ আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল। ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আয় সেই অনুপাতে না বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানোর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ভিন্নধর্মী প্রবণতার কারণে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে পাচ্ছেন না।অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম বাধা। বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।তাঁদের মতে, একসঙ্গে অনেক উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।সামগ্রিকভাবে, রাজস্ব ঘাটতি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, উন্নয়ন ব্যয়ের স্থবিরতা এবং আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি থাকার চাপ দেশের অর্থনীতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।