বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), বায়োমেট্রিক তথ্য, পাসপোর্ট নম্বরসহ সংবেদনশীল তথ্য বেহাত হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেরা বিষয়টি শনাক্ত করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতার অভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত শনাক্তকারী তথ্য (পিআইআই), এনআইডি, বায়োমেট্রিক রেকর্ড ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য।
গবেষণায় তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলোকে ‘ইনস্টিটিউশনাল ব্লাইন্ডনেস’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেরা কোনো নিরাপত্তা সংকেত শনাক্ত করতে পারেনি।
নিরাপত্তা গবেষক, গণমাধ্যম অথবা ডার্ক ওয়েব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সামনে আসে। খুব অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থায় সমস্যা শনাক্ত করতে পেরেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তথ্য ফাঁসের পর অনেক প্রতিষ্ঠান নীরব থেকেছে বা বিষয়টি অস্বীকার করেছে। অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা নিরাপত্তা পর্যালোচনা প্রকাশ করা হয়নি।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, পাসওয়ার্ড বা পিন পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও আঙুলের ছাপ বা আইরিসের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য একবার ফাঁস হলে তা আর পরিবর্তন করা যায় না। ফলে এসব তথ্যের অপব্যবহার নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক তথ্যের ব্যবহার বেড়েছে। এনআইডি, মোবাইল সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এসব তথ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাঠামো এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য ব্যবস্থাপনা। অন্তত পাঁচটি ঘটনায় ইসির তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ভোটার তথ্য টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশ, ২০২৫ সালে বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটা প্রকাশের ঘটনা রয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তাদের মূল ডেটাবেজ সরাসরি হ্যাক হয়নি; বরং তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন চ্যানেল ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
গবেষণায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একাধিক বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য, এনআইডি তথ্য, এনটিএমসি সংক্রান্ত তথ্য, সরকারি প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীর তথ্য, পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডেটা ফাঁসের বিষয় রয়েছে।
গবেষকদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।
তারা মনে করছেন, নাগরিক তথ্য সুরক্ষায় শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, দ্রুত ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), বায়োমেট্রিক তথ্য, পাসপোর্ট নম্বরসহ সংবেদনশীল তথ্য বেহাত হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেরা বিষয়টি শনাক্ত করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতার অভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত শনাক্তকারী তথ্য (পিআইআই), এনআইডি, বায়োমেট্রিক রেকর্ড ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য।
গবেষণায় তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলোকে ‘ইনস্টিটিউশনাল ব্লাইন্ডনেস’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেরা কোনো নিরাপত্তা সংকেত শনাক্ত করতে পারেনি।
নিরাপত্তা গবেষক, গণমাধ্যম অথবা ডার্ক ওয়েব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সামনে আসে। খুব অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থায় সমস্যা শনাক্ত করতে পেরেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তথ্য ফাঁসের পর অনেক প্রতিষ্ঠান নীরব থেকেছে বা বিষয়টি অস্বীকার করেছে। অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা নিরাপত্তা পর্যালোচনা প্রকাশ করা হয়নি।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, পাসওয়ার্ড বা পিন পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও আঙুলের ছাপ বা আইরিসের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য একবার ফাঁস হলে তা আর পরিবর্তন করা যায় না। ফলে এসব তথ্যের অপব্যবহার নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক তথ্যের ব্যবহার বেড়েছে। এনআইডি, মোবাইল সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এসব তথ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাঠামো এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য ব্যবস্থাপনা। অন্তত পাঁচটি ঘটনায় ইসির তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ভোটার তথ্য টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশ, ২০২৫ সালে বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটা প্রকাশের ঘটনা রয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তাদের মূল ডেটাবেজ সরাসরি হ্যাক হয়নি; বরং তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন চ্যানেল ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
গবেষণায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একাধিক বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য, এনআইডি তথ্য, এনটিএমসি সংক্রান্ত তথ্য, সরকারি প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীর তথ্য, পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডেটা ফাঁসের বিষয় রয়েছে।
গবেষকদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।
তারা মনে করছেন, নাগরিক তথ্য সুরক্ষায় শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, দ্রুত ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
