গভীর জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আলী বাবা একদিন দেখতে পান একদল ঘোড়সওয়ারকে। তারা ছিল চল্লিশ চোর। পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দলের নেতা উচ্চারণ করেন রহস্যময় শব্দ—‘খুল যা সিমসিম’। মুহূর্তেই খুলে যায় পাথরের দরজা। ভেতরে ছিল সোনা, রুপা, রত্ন আর অগাধ সম্পদের ভাণ্ডার।
শৈশব থেকে শোনা এই গল্পে আলী বাবা, মরজিয়ানা, চল্লিশ চোর ও সেই জাদুকরি মন্ত্র আজও মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেয়। তবে গল্পটির সবচেয়ে বড় রহস্য গুহার সম্পদে নয়, বরং এর জন্ম ইতিহাসে।
আলী বাবা কি সত্যিই কোনো ব্যক্তি ছিলেন? চল্লিশ চোর কি বাস্তব কোনো দল ছিল? সেই গুহাই বা কোথায়? আর ‘খুল যা সিমসিম’ কথাটির উৎসই বা কী?
সাধারণভাবে আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পকে ‘আরব্য রজনী’র অংশ মনে করা হলেও প্রাচীনতম পরিচিত আরবি পাণ্ডুলিপিগুলোতে এই গল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
‘আরব্য রজনী’ কোনো একক লেখকের লেখা বই নয়। বহু শতাব্দী ধরে পারস্য, আরব ও ভারতীয় অঞ্চলের নানা গল্প যুক্ত হয়ে এটি একটি বিশাল গল্পসংকলনে পরিণত হয়েছে।
ইউরোপে এই গল্পগুলো জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ফরাসি প্রাচ্যবিদ আন্তোয়ান গ্যালাঁ। ১৭০৪ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত তার ফরাসি সংস্করণেই প্রথম পরিচিত লিখিত রূপে আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প পাওয়া যায়।
আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিরীয় গল্পকথক হান্না দিয়াবের নাম। ১৭০৯ সালে প্যারিসে তার সঙ্গে গ্যালাঁর সাক্ষাৎ হয়। গ্যালাঁর ব্যক্তিগত নোট থেকে জানা যায়, দিয়াব তাকে একাধিক গল্প বলেছিলেন।
গবেষকদের ধারণা, আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পও সম্ভবত দিয়াবের কাছ থেকে পাওয়া কোনো লোককাহিনি, যা গ্যালাঁ সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন।
তবে দিয়াবই গল্পটির মূল লেখক ছিলেন—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং তিনি কোনো প্রচলিত গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বাহক ছিলেন বলেই মনে করা হয়।
ইতিহাসে আলী বাবা নামে কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে চল্লিশ চোর বা গুপ্তধনের গুহারও কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
তবে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বণিক কাফেলা, পাহাড়ি গুহা, ডাকাত ও লুকানো সম্পদ নিয়ে বহু লোককাহিনি প্রচলিত ছিল। সেসব গল্পের উপাদান থেকেই আলী বাবার কাহিনির জন্ম হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
গল্পে চোরের সংখ্যা ৪০ হওয়াটিও প্রতীকী হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী সংস্কৃতিতে ৪০ একটি পরিচিত প্রতীকী সংখ্যা। তাই এটি কোনো বাস্তব ৪০ সদস্যের ডাকাত দলের সংখ্যা—এমন প্রমাণ নেই।
লোককাহিনিতে নির্দিষ্ট সংখ্যা অনেক সময় গল্পকে স্মরণীয় ও অর্থবহ করে তুলতে ব্যবহৃত হয়।
ইন্টারনেট ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা গল্পে ইরান, ইরাক বা সিরিয়ার বিভিন্ন গুহাকে আলী বাবার গুহা বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট গুহাকে এই গল্পের আসল স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
সম্ভবত গুহাটি বাস্তব কোনো জায়গা নয়, বরং লোককাহিনির কল্পিত এক রহস্যময় স্থান।
গল্পের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো জাদুকরি মন্ত্র ‘খুল যা সিমসিম’। ইংরেজিতে এটি পরিচিত ‘Open Sesame’ নামে।
ফরাসি সংস্করণে এর রূপ ছিল ‘Sésame, ouvre-toi’। অনেকের মতে, তিলের শুঁটি পাকলে নিজে থেকে ফেটে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য থেকেই এই শব্দের প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত নয়।
গল্পে আলী বাবার নাম থাকলেও সবচেয়ে বুদ্ধিমান চরিত্র মরজিয়ানা। চল্লিশ চোরের ষড়যন্ত্র বারবার বুঝে তিনি নিজের বুদ্ধি ও সাহস দিয়ে আলী বাবাকে রক্ষা করেন।
এই কারণেই আধুনিক পাঠে মরজিয়ানা শুধু সহকারী চরিত্র নন, বরং গল্পের অন্যতম প্রধান নায়ক।
গ্যালাঁর সংস্করণের পর আলী বাবা ও চল্লিশ চোর ইউরোপসহ বিশ্বের নানা ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে। বই, নাটক, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গল্পটি নতুন নতুন রূপ পেয়েছে।
একটি কাল্পনিক গুহার মন্ত্র ‘Open Sesame’ শেষ পর্যন্ত বাস্তব ভাষার অংশ হয়ে গেছে।
আলী বাবার গল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ সোনা-রত্ন নয়। এর আসল গুপ্তধন হলো মানুষের গল্প বলার ঐতিহ্য।
একটি মৌখিক গল্প কীভাবে শত শত বছর পেরিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে, আলী বাবা ও চল্লিশ চোর তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
গভীর জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আলী বাবা একদিন দেখতে পান একদল ঘোড়সওয়ারকে। তারা ছিল চল্লিশ চোর। পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দলের নেতা উচ্চারণ করেন রহস্যময় শব্দ—‘খুল যা সিমসিম’। মুহূর্তেই খুলে যায় পাথরের দরজা। ভেতরে ছিল সোনা, রুপা, রত্ন আর অগাধ সম্পদের ভাণ্ডার।
শৈশব থেকে শোনা এই গল্পে আলী বাবা, মরজিয়ানা, চল্লিশ চোর ও সেই জাদুকরি মন্ত্র আজও মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেয়। তবে গল্পটির সবচেয়ে বড় রহস্য গুহার সম্পদে নয়, বরং এর জন্ম ইতিহাসে।
আলী বাবা কি সত্যিই কোনো ব্যক্তি ছিলেন? চল্লিশ চোর কি বাস্তব কোনো দল ছিল? সেই গুহাই বা কোথায়? আর ‘খুল যা সিমসিম’ কথাটির উৎসই বা কী?
সাধারণভাবে আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পকে ‘আরব্য রজনী’র অংশ মনে করা হলেও প্রাচীনতম পরিচিত আরবি পাণ্ডুলিপিগুলোতে এই গল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
‘আরব্য রজনী’ কোনো একক লেখকের লেখা বই নয়। বহু শতাব্দী ধরে পারস্য, আরব ও ভারতীয় অঞ্চলের নানা গল্প যুক্ত হয়ে এটি একটি বিশাল গল্পসংকলনে পরিণত হয়েছে।
ইউরোপে এই গল্পগুলো জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ফরাসি প্রাচ্যবিদ আন্তোয়ান গ্যালাঁ। ১৭০৪ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত তার ফরাসি সংস্করণেই প্রথম পরিচিত লিখিত রূপে আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প পাওয়া যায়।
আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিরীয় গল্পকথক হান্না দিয়াবের নাম। ১৭০৯ সালে প্যারিসে তার সঙ্গে গ্যালাঁর সাক্ষাৎ হয়। গ্যালাঁর ব্যক্তিগত নোট থেকে জানা যায়, দিয়াব তাকে একাধিক গল্প বলেছিলেন।
গবেষকদের ধারণা, আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পও সম্ভবত দিয়াবের কাছ থেকে পাওয়া কোনো লোককাহিনি, যা গ্যালাঁ সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন।
তবে দিয়াবই গল্পটির মূল লেখক ছিলেন—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং তিনি কোনো প্রচলিত গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বাহক ছিলেন বলেই মনে করা হয়।
ইতিহাসে আলী বাবা নামে কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে চল্লিশ চোর বা গুপ্তধনের গুহারও কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
তবে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বণিক কাফেলা, পাহাড়ি গুহা, ডাকাত ও লুকানো সম্পদ নিয়ে বহু লোককাহিনি প্রচলিত ছিল। সেসব গল্পের উপাদান থেকেই আলী বাবার কাহিনির জন্ম হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
গল্পে চোরের সংখ্যা ৪০ হওয়াটিও প্রতীকী হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী সংস্কৃতিতে ৪০ একটি পরিচিত প্রতীকী সংখ্যা। তাই এটি কোনো বাস্তব ৪০ সদস্যের ডাকাত দলের সংখ্যা—এমন প্রমাণ নেই।
লোককাহিনিতে নির্দিষ্ট সংখ্যা অনেক সময় গল্পকে স্মরণীয় ও অর্থবহ করে তুলতে ব্যবহৃত হয়।
ইন্টারনেট ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা গল্পে ইরান, ইরাক বা সিরিয়ার বিভিন্ন গুহাকে আলী বাবার গুহা বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট গুহাকে এই গল্পের আসল স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
সম্ভবত গুহাটি বাস্তব কোনো জায়গা নয়, বরং লোককাহিনির কল্পিত এক রহস্যময় স্থান।
গল্পের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো জাদুকরি মন্ত্র ‘খুল যা সিমসিম’। ইংরেজিতে এটি পরিচিত ‘Open Sesame’ নামে।
ফরাসি সংস্করণে এর রূপ ছিল ‘Sésame, ouvre-toi’। অনেকের মতে, তিলের শুঁটি পাকলে নিজে থেকে ফেটে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য থেকেই এই শব্দের প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত নয়।
গল্পে আলী বাবার নাম থাকলেও সবচেয়ে বুদ্ধিমান চরিত্র মরজিয়ানা। চল্লিশ চোরের ষড়যন্ত্র বারবার বুঝে তিনি নিজের বুদ্ধি ও সাহস দিয়ে আলী বাবাকে রক্ষা করেন।
এই কারণেই আধুনিক পাঠে মরজিয়ানা শুধু সহকারী চরিত্র নন, বরং গল্পের অন্যতম প্রধান নায়ক।
গ্যালাঁর সংস্করণের পর আলী বাবা ও চল্লিশ চোর ইউরোপসহ বিশ্বের নানা ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে। বই, নাটক, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গল্পটি নতুন নতুন রূপ পেয়েছে।
একটি কাল্পনিক গুহার মন্ত্র ‘Open Sesame’ শেষ পর্যন্ত বাস্তব ভাষার অংশ হয়ে গেছে।
আলী বাবার গল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ সোনা-রত্ন নয়। এর আসল গুপ্তধন হলো মানুষের গল্প বলার ঐতিহ্য।
একটি মৌখিক গল্প কীভাবে শত শত বছর পেরিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে, আলী বাবা ও চল্লিশ চোর তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।
