মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

সারাদেশ

পড়ার টেবিল নেই, খেলার মাঠও নেই: তবু জাতীয় মঞ্চে তিশার বিজয়দৌড়

পড়ার টেবিল নেই, খেলার মাঠও নেই: তবু জাতীয় মঞ্চে তিশার বিজয়দৌড়
ছবি: চেকপোস্ট

তিশার নেই পড়াশোনার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ার বিদ্যালয়ে নেই অনুশীলনের জন্য কোনো খেলার মাঠ সংসারে অভাব, চারদিকে সীমাবদ্ধতা কিন্তু এসব প্রতিকূলতা এক কিশোরীর স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর অশেষ আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে নিজের নাম লিখিয়েছে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার শৈলজুড়া গ্রামের মেয়ে তিশা আক্তার

স্থানীয় মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তিশা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে এগিয়ে নেওয়ার মতো পরিবেশ তার ছিল না। অর্থাভাবে অনেক প্রয়োজনই অপূর্ণ থেকেছে। তবু কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি মেয়েটি। পরিবারের অনুপ্রেরণা আর শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রতিদিন নিজেকে আরও প্রস্তুত করেছে

বিদ্যালয়ে নেই কোনো খেলার মাঠ। অন্য জায়গায় গিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্রীড়া সরঞ্জামও ছিল না। তারপরও থেমে থাকেনি তার দৌড়। কারণ তিশা বিশ্বাস করত; সুযোগ না থাকলেও চেষ্টা থাকলে একদিন সফল হওয়া সম্ভব সেই বিশ্বাসই তাকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ে

শিশু কিশোর-কিশোরীদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত দেশব্যাপীনতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২০২৬প্রতিযোগিতায় প্রথমে উপজেলা, এরপর জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে তিশা। এরপর জাতীয় পর্যায়ের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে শুধু নিজের নয়, পুরো হবিগঞ্জ জেলার জন্য গৌরব বয়ে আনে

গত ২৭ জুলাই ঢাকার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে দ্বিতীয় পুরস্কার গ্রহণ করে সে। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের সেই মুহূর্ত আজও তিশার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে দেয়

তিশা জানায়, জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হওয়া তার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে এখানেই থেমে থাকতে চায় না সে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। সেই স্বপ্ন পূরণে সে প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সকল মানুষের সহযোগিতা দোয়া কামনা করেছে

তিশার এই সাফল্যে আনন্দে ভাসছে তার সহপাঠীরাও। তাদের ভাষায়, একই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে সফল হওয়ায় তারাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে সফল হওয়া সম্ভব-তিশা তাদের সামনে সেই উদাহরণ তৈরি করেছে

মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক মো. জুয়েল আহমেদ বলেন, শুরু থেকেই খেলাধুলার প্রতি তিশার ছিল অসাধারণ আগ্রহ নিষ্ঠা। নিয়মিত অনুশীলন এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজকের এই অর্জন। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিশা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে সক্ষম হবে

মেয়ের এই অর্জনে আনন্দে চোখ ভিজে আসে বাবা-মায়ের। তারা বলেন, অভাবের সংসারে মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। তারপরও মেয়ে হাল ছাড়েনি। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা, সরকার, জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়া সংস্থা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি তিশার পাশে দাঁড়ান, তাহলে সে আরও বড় সাফল্য এনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবে

স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, গ্রামের অনেক প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ে শুধু সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। তিশার মতো মেধাবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত অনুশীলনের পরিবেশ এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হবিগঞ্জ থেকেই জাতীয় আন্তর্জাতিক মানের আরও অনেক ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ উদ্দিন বাবর বলেন, তিশার এই অর্জন শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। শুরু থেকেই শিক্ষকরা তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও বিদ্যালয় তার পাশে থাকবে

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কাউছার শোকরানা বলেন, তিশার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। তার মতো আরও অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থীকে এগিয়ে আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

তিশার গল্প কেবল একটি পদক জয়ের গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প। এটি সেই কিশোরীর গল্প, যে অভাবকে অজুহাত বানায়নি; বরং সংগ্রামকে শক্তিতে পরিণত করেছে

আজও যে মেয়েটির নিজের পড়ার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ার নেই, যে বিদ্যালয়ে নেই একটি পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ, সেই মেয়েটিই জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে হবিগঞ্জের নাম উজ্জ্বল করেছে। অথচ তার স্বপ্ন আরও বড়। সে বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়

সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা, একটু পৃষ্ঠপোষকতা আর সবার আন্তরিক ভালোবাসা

হয়তো আজ যদি রাষ্ট্র, ক্রীড়া সংস্থা, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং শুভানুধ্যায়ীরা তিশার পাশে দাঁড়ান, তাহলে একদিন এই হতদরিদ্র গ্রামের মেয়েটিই আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দেবে, স্বপ্নের কাছে দারিদ্র্য কখনোই পরাজয়ের কারণ হতে পারে না

চেকপোস্ট

মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬


পড়ার টেবিল নেই, খেলার মাঠও নেই: তবু জাতীয় মঞ্চে তিশার বিজয়দৌড়

প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

তিশার নেই পড়াশোনার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ার বিদ্যালয়ে নেই অনুশীলনের জন্য কোনো খেলার মাঠ সংসারে অভাব, চারদিকে সীমাবদ্ধতা কিন্তু এসব প্রতিকূলতা এক কিশোরীর স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর অশেষ আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে নিজের নাম লিখিয়েছে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার শৈলজুড়া গ্রামের মেয়ে তিশা আক্তার

স্থানীয় মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তিশা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে এগিয়ে নেওয়ার মতো পরিবেশ তার ছিল না। অর্থাভাবে অনেক প্রয়োজনই অপূর্ণ থেকেছে। তবু কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি মেয়েটি। পরিবারের অনুপ্রেরণা আর শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রতিদিন নিজেকে আরও প্রস্তুত করেছে

বিদ্যালয়ে নেই কোনো খেলার মাঠ। অন্য জায়গায় গিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্রীড়া সরঞ্জামও ছিল না। তারপরও থেমে থাকেনি তার দৌড়। কারণ তিশা বিশ্বাস করত; সুযোগ না থাকলেও চেষ্টা থাকলে একদিন সফল হওয়া সম্ভব সেই বিশ্বাসই তাকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ে

শিশু কিশোর-কিশোরীদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত দেশব্যাপীনতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২০২৬প্রতিযোগিতায় প্রথমে উপজেলা, এরপর জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে তিশা। এরপর জাতীয় পর্যায়ের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে শুধু নিজের নয়, পুরো হবিগঞ্জ জেলার জন্য গৌরব বয়ে আনে

গত ২৭ জুলাই ঢাকার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে দ্বিতীয় পুরস্কার গ্রহণ করে সে। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের সেই মুহূর্ত আজও তিশার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে দেয়

তিশা জানায়, জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হওয়া তার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে এখানেই থেমে থাকতে চায় না সে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। সেই স্বপ্ন পূরণে সে প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সকল মানুষের সহযোগিতা দোয়া কামনা করেছে

তিশার এই সাফল্যে আনন্দে ভাসছে তার সহপাঠীরাও। তাদের ভাষায়, একই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে সফল হওয়ায় তারাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে সফল হওয়া সম্ভব-তিশা তাদের সামনে সেই উদাহরণ তৈরি করেছে

মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক মো. জুয়েল আহমেদ বলেন, শুরু থেকেই খেলাধুলার প্রতি তিশার ছিল অসাধারণ আগ্রহ নিষ্ঠা। নিয়মিত অনুশীলন এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজকের এই অর্জন। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিশা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে সক্ষম হবে

মেয়ের এই অর্জনে আনন্দে চোখ ভিজে আসে বাবা-মায়ের। তারা বলেন, অভাবের সংসারে মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। তারপরও মেয়ে হাল ছাড়েনি। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা, সরকার, জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়া সংস্থা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি তিশার পাশে দাঁড়ান, তাহলে সে আরও বড় সাফল্য এনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবে

স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, গ্রামের অনেক প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ে শুধু সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। তিশার মতো মেধাবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত অনুশীলনের পরিবেশ এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হবিগঞ্জ থেকেই জাতীয় আন্তর্জাতিক মানের আরও অনেক ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ উদ্দিন বাবর বলেন, তিশার এই অর্জন শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। শুরু থেকেই শিক্ষকরা তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও বিদ্যালয় তার পাশে থাকবে

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কাউছার শোকরানা বলেন, তিশার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। তার মতো আরও অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থীকে এগিয়ে আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

তিশার গল্প কেবল একটি পদক জয়ের গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প। এটি সেই কিশোরীর গল্প, যে অভাবকে অজুহাত বানায়নি; বরং সংগ্রামকে শক্তিতে পরিণত করেছে

আজও যে মেয়েটির নিজের পড়ার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ার নেই, যে বিদ্যালয়ে নেই একটি পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ, সেই মেয়েটিই জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে হবিগঞ্জের নাম উজ্জ্বল করেছে। অথচ তার স্বপ্ন আরও বড়। সে বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়

সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা, একটু পৃষ্ঠপোষকতা আর সবার আন্তরিক ভালোবাসা

হয়তো আজ যদি রাষ্ট্র, ক্রীড়া সংস্থা, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং শুভানুধ্যায়ীরা তিশার পাশে দাঁড়ান, তাহলে একদিন এই হতদরিদ্র গ্রামের মেয়েটিই আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দেবে, স্বপ্নের কাছে দারিদ্র্য কখনোই পরাজয়ের কারণ হতে পারে না


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত