শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

জাতীয়

প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়ন কঠিন

তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক, বড় বাধা দক্ষ শিক্ষক সংকট

তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক, বড় বাধা দক্ষ শিক্ষক সংকট
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

২০২৮ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ শিক্ষকের সংকট।

দেশের প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়েই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। সেখানে জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ বা জার্মানের মতো বিদেশি ভাষার শিক্ষক নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিবেচনায় বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে ঋণ সুবিধার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দক্ষ ভাষা শিক্ষক কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে বিদেশি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করাও বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন।

শিক্ষাবিদদের মতে, ভাষা শেখানো শুধু বইনির্ভর বিষয় নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ব্যবহারিক পরিবেশ এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ। এসব নিশ্চিত না হলে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যকর ফল দেবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আক্তার বানু বলেন, ভাষা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা। পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়া বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ইংরেজির অভিজ্ঞতা, নতুন ভাষায় শঙ্কা

শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ভাষা শিক্ষার বড় সমস্যা হলো ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে পরীক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য তা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুরুতে তৃতীয় ভাষাকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও ফলাফল বিবেচনা করে পরে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

এনসিটিবির প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, নতুন কোনো বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে গবেষণা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং বাস্তবতা যাচাই প্রয়োজন।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৭ সালের পাঠ্যক্রম ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তাই ২০২৮ সাল থেকে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার আগে আরও পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।

এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস বলেন, তৃতীয় ভাষার ক্ষেত্রে কোন ভাষাগুলো নির্বাচন করা হবে, আঞ্চলিক চাহিদা নাকি শিক্ষার্থীদের পছন্দ—এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলা বইয়ে আসছে তৃতীয় ভাষার অধ্যায়

২০২৭ সালের পাঠ্যক্রমে আলাদা বই হিসেবে তৃতীয় ভাষা যুক্ত না হলেও বাংলা বইয়ে এ বিষয়ে একটি অধ্যায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৃতীয় ভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানান, ‘তৃতীয় ভাষার গুরুত্ব’ শিরোনামে একটি অধ্যায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

দেশের ২৫টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এসব কেন্দ্রে জাপানিজ, কোরিয়ান, চাইনিজ, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানো হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা চালুর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দক্ষ শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। তাহলেই এই উদ্যোগ বাস্তব অর্থে সফল হতে পারে।

#তৃতীয়ভাষা_শিক্ষা #শিক্ষাব্যবস্থা_সংস্কার #দক্ষ_শিক্ষক_সংকট

চেকপোস্ট

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬


তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক, বড় বাধা দক্ষ শিক্ষক সংকট

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৮ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ শিক্ষকের সংকট।

দেশের প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়েই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। সেখানে জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ বা জার্মানের মতো বিদেশি ভাষার শিক্ষক নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিবেচনায় বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে ঋণ সুবিধার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দক্ষ ভাষা শিক্ষক কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে বিদেশি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করাও বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন।

শিক্ষাবিদদের মতে, ভাষা শেখানো শুধু বইনির্ভর বিষয় নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ব্যবহারিক পরিবেশ এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ। এসব নিশ্চিত না হলে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যকর ফল দেবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আক্তার বানু বলেন, ভাষা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা। পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়া বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ইংরেজির অভিজ্ঞতা, নতুন ভাষায় শঙ্কা

শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ভাষা শিক্ষার বড় সমস্যা হলো ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে পরীক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য তা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুরুতে তৃতীয় ভাষাকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও ফলাফল বিবেচনা করে পরে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

এনসিটিবির প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, নতুন কোনো বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে গবেষণা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং বাস্তবতা যাচাই প্রয়োজন।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৭ সালের পাঠ্যক্রম ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তাই ২০২৮ সাল থেকে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার আগে আরও পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।

এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস বলেন, তৃতীয় ভাষার ক্ষেত্রে কোন ভাষাগুলো নির্বাচন করা হবে, আঞ্চলিক চাহিদা নাকি শিক্ষার্থীদের পছন্দ—এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলা বইয়ে আসছে তৃতীয় ভাষার অধ্যায়

২০২৭ সালের পাঠ্যক্রমে আলাদা বই হিসেবে তৃতীয় ভাষা যুক্ত না হলেও বাংলা বইয়ে এ বিষয়ে একটি অধ্যায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৃতীয় ভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানান, ‘তৃতীয় ভাষার গুরুত্ব’ শিরোনামে একটি অধ্যায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

দেশের ২৫টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এসব কেন্দ্রে জাপানিজ, কোরিয়ান, চাইনিজ, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানো হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা চালুর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দক্ষ শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। তাহলেই এই উদ্যোগ বাস্তব অর্থে সফল হতে পারে।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত