দেশের পাঁচটি ডপলার আবহাওয়া রাডারের সবকটিই বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়, ভারী বর্ষণ, কালবৈশাখীসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম ও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিকল্প হিসেবে বর্তমানে অন্য সংস্থার, বিশেষ করে বিমানবাহিনীর রাডার তথ্য ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা, কক্সবাজার, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, রংপুর ও মৌলভীবাজারে স্থাপিত পাঁচটি ডপলার রাডারের মধ্যে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি ত্রুটি, যন্ত্রাংশের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো রয়েছে। রংপুরের রাডারটি চলতি বছরের ১৭ জুন থেকে কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ৪ জুলাই বিদ্যুৎ সংযোগজনিত সমস্যার কারণে ঢাকার রাডারটিও অচল হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাডার অচল থাকায় সমুদ্রে সৃষ্ট লঘুচাপ, ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভারী বৃষ্টিপাতের গতিপ্রকৃতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি বাড়ছে।
জলবায়ু গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাডারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দ্রুত রাডারগুলো সচল করে উপকূলবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, একটি ডপলার রাডার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। রাডার সচল থাকলে উপকূলে আঘাত হানার অন্তত ১২ ঘণ্টা থেকে এক দিন আগেই ঝড়ের অবস্থান, গতিপথ ও গতিবেগ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। কিন্তু উপকূলীয় রাডারগুলো অচল থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা
আবহাওয়াবিদ তারিফুল কবির নেওয়াজ জানান, কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। রংপুরের রাডারের অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর (এভিআর)-এ সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ওয়ারেন্টির আওতায় জাপানি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা এসে এটি মেরামত করবেন।
তিনি আরও জানান, ঢাকার রাডারটি বিদ্যুৎ সংযোগজনিত সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে এবং প্রকৌশলীরা এটি দ্রুত সচল করার কাজ করছেন। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর রাডার তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
আসছে শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’
রাডার অচল থাকার মধ্যেই দেশের দিকে এগিয়ে আসছে চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় শক্তিশালী মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’। বেসরকারি আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি) জানিয়েছে, ৫ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর মধ্যে ৭ থেকে ১১ জুলাই বৃষ্টিবলয়টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে।
সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে রংপুর ও রাজশাহীতে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির প্রভাবে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। টানা বর্ষণে উপকূলীয় এবং নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও রয়েছে।

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
দেশের পাঁচটি ডপলার আবহাওয়া রাডারের সবকটিই বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়, ভারী বর্ষণ, কালবৈশাখীসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম ও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিকল্প হিসেবে বর্তমানে অন্য সংস্থার, বিশেষ করে বিমানবাহিনীর রাডার তথ্য ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা, কক্সবাজার, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, রংপুর ও মৌলভীবাজারে স্থাপিত পাঁচটি ডপলার রাডারের মধ্যে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি ত্রুটি, যন্ত্রাংশের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো রয়েছে। রংপুরের রাডারটি চলতি বছরের ১৭ জুন থেকে কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ৪ জুলাই বিদ্যুৎ সংযোগজনিত সমস্যার কারণে ঢাকার রাডারটিও অচল হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাডার অচল থাকায় সমুদ্রে সৃষ্ট লঘুচাপ, ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভারী বৃষ্টিপাতের গতিপ্রকৃতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি বাড়ছে।
জলবায়ু গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাডারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দ্রুত রাডারগুলো সচল করে উপকূলবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, একটি ডপলার রাডার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। রাডার সচল থাকলে উপকূলে আঘাত হানার অন্তত ১২ ঘণ্টা থেকে এক দিন আগেই ঝড়ের অবস্থান, গতিপথ ও গতিবেগ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। কিন্তু উপকূলীয় রাডারগুলো অচল থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা
আবহাওয়াবিদ তারিফুল কবির নেওয়াজ জানান, কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। রংপুরের রাডারের অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর (এভিআর)-এ সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ওয়ারেন্টির আওতায় জাপানি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা এসে এটি মেরামত করবেন।
তিনি আরও জানান, ঢাকার রাডারটি বিদ্যুৎ সংযোগজনিত সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে এবং প্রকৌশলীরা এটি দ্রুত সচল করার কাজ করছেন। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর রাডার তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
আসছে শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’
রাডার অচল থাকার মধ্যেই দেশের দিকে এগিয়ে আসছে চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় শক্তিশালী মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’। বেসরকারি আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি) জানিয়েছে, ৫ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর মধ্যে ৭ থেকে ১১ জুলাই বৃষ্টিবলয়টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে।
সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে রংপুর ও রাজশাহীতে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির প্রভাবে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। টানা বর্ষণে উপকূলীয় এবং নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও রয়েছে।
