দেশজুড়ে গ্রামীণ ভোটারদের গণভোটের গল্প
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
দেশজুড়ে আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলেও দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাট-বাজার, চায়ের দোকান কিংবা গ্রাম্য আড্ডায় গণভোট নিয়ে আলোচনা সীমিত থাকলেও এর প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের ধারণা এখনো অস্পষ্ট।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের সাধারণ মানুষ গণভোট কী, কেন এটি আয়োজন করা হচ্ছে এবং ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানেন না। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাবে অনেক ভোটারের মধ্যেই আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভ্রান্তিও দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উঠান বৈঠক, ইউনিয়নভিত্তিক সভা কিংবা সরাসরি ব্যাখ্যার ঘাটতির কারণে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে গণভোট নিয়ে অজ্ঞতা রয়ে গেছে। অনেকে গণভোটকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন। এতে গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—গণভোটে কোন প্রশ্নে ভোট গ্রহণ করা হবে, সেটিও বেশির ভাগ ভোটারের কাছে অজানা। গ্রামীণ এলাকায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক ভোটার কার্যত অন্ধকারেই রয়েছেন।
খানসামা উপজেলার খামারপাড়া ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “নির্বাচন ও ভোটের বিষয়টা আমরা বুঝি। কিন্তু গণভোট কী, কেন হচ্ছে—এটা কেউ পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়নি। না বুঝে ভোট দিলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।”
একই ইউনিয়নের ভ্যানচালক এনামুল হক বলেন, “ভোট হবে জানি, ভোট দেবও। কিন্তু গণভোট কোন বিষয়ে হচ্ছে, সেটাই কেউ আমাদের বলেনি। গ্রামে এসে যদি বোঝানো হতো, তাহলে ভালো হতো।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে গণভোট নতুন একটি ধারণা হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও সক্রিয় ও ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উঠান বৈঠক, মাইকিং, ইউনিয়নভিত্তিক সভা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে সহজ ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরলে ভোটারদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, খানসামা উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭৭ হাজার ৫২২ জন, নারী ভোটার ৭৬ হাজার ৪৩৬ জন এবং হিজড়া ভোটার একজন। এই বিপুল ভোটার সংখ্যার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সচেতনতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “গণভোট বিষয়ে ইতোমধ্যে উপজেলার নিজস্ব অর্থায়নে ১২ হাজার লিফলেট এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর থেকে পাওয়া প্রায় ১৫ হাজার লিফলেট ইউনিয়ন উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় গণভোটের বিষয়টি পৌঁছে দিতে ধারাবাহিক প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো—ভোটাররা যেন গণভোটকে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট হিসেবে না বোঝেন। গণভোট একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে জনগণের মতামত গ্রহণের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গণভোটের বিষয়টি উপস্থাপন করা না গেলে অনেক ভোটার না বুঝেই ভোট দিতে পারেন। এতে গণভোটের উদ্দেশ্য ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হলে ভোটার অংশগ্রহণ ও গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত