বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জহির রায়হান। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি রেখে গেছেন এমন এক সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার, যা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমলিন।
আজ ১৯ আগস্ট, কিংবদন্তি এই কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার ৯১তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের চিন্তায় যুক্ত হন তিনি।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তার জীবন ও সৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন জহির রায়হান। ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলে অংশ নিয়ে তিনি গ্রেপ্তারও হন। ভাষা আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে শক্তিশালীভাবে উঠে আসে।
তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ ভাষা আন্দোলনের চেতনার অন্যতম সাহিত্যিক দলিল। এর অমর উচ্চারণ—‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব’—আজও প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের প্রতীক।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। পরে ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘বরফ গলা নদী’সহ একাধিক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেন তিনি।
‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সমাজবাস্তবতা তুলে ধরেন জহির রায়হান। এ কাজের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও চলচ্চিত্রে এসে নিজের প্রতিভার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটান জহির রায়হান।
১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’।
এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’র মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র এবং ‘বাহানা’ ছিল প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।
তার চলচ্চিত্রে শুধু বিনোদন নয়, উঠে এসেছে সমাজ, রাজনীতি, মানুষের বঞ্চনা ও প্রতিবাদের গল্প।
জহির রায়হানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’। প্রতীকী গল্পের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন, স্বৈরাচার ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ছবিটি প্রদর্শন করে পাওয়া অর্থ মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে এই চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্যামেরাকে তিনি শুধু শিল্পের মাধ্যম নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সক্রিয় হন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হন তিনি।
এরপর আর ফিরে আসেননি এই কিংবদন্তি নির্মাতা। তার মরদেহও কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় অধ্যায় হয়ে আছে।
জহির রায়হানের জীবন থেমে গেলেও তার সৃষ্টি থামেনি। তার সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাজ আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি ছিলেন একসঙ্গে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, ভাষাসৈনিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রতিবাদী সংস্কৃতির প্রতীক।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবন—কিন্তু সৃষ্টির বিস্তারে তিনি হয়ে উঠেছেন শতাব্দীর একজন। জহির রায়হান তাই শুধু একটি নাম নয়, বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অনন্ত অধ্যায়।

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জহির রায়হান। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি রেখে গেছেন এমন এক সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার, যা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমলিন।
আজ ১৯ আগস্ট, কিংবদন্তি এই কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার ৯১তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তনের চিন্তায় যুক্ত হন তিনি।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তার জীবন ও সৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন জহির রায়হান। ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলে অংশ নিয়ে তিনি গ্রেপ্তারও হন। ভাষা আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে শক্তিশালীভাবে উঠে আসে।
তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ ভাষা আন্দোলনের চেতনার অন্যতম সাহিত্যিক দলিল। এর অমর উচ্চারণ—‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব’—আজও প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের প্রতীক।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। পরে ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘বরফ গলা নদী’সহ একাধিক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেন তিনি।
‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সমাজবাস্তবতা তুলে ধরেন জহির রায়হান। এ কাজের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও চলচ্চিত্রে এসে নিজের প্রতিভার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটান জহির রায়হান।
১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’।
এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’র মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র এবং ‘বাহানা’ ছিল প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।
তার চলচ্চিত্রে শুধু বিনোদন নয়, উঠে এসেছে সমাজ, রাজনীতি, মানুষের বঞ্চনা ও প্রতিবাদের গল্প।
জহির রায়হানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’। প্রতীকী গল্পের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন, স্বৈরাচার ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ছবিটি প্রদর্শন করে পাওয়া অর্থ মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে এই চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্যামেরাকে তিনি শুধু শিল্পের মাধ্যম নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সক্রিয় হন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হন তিনি।
এরপর আর ফিরে আসেননি এই কিংবদন্তি নির্মাতা। তার মরদেহও কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় অধ্যায় হয়ে আছে।
জহির রায়হানের জীবন থেমে গেলেও তার সৃষ্টি থামেনি। তার সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাজ আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি ছিলেন একসঙ্গে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, ভাষাসৈনিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রতিবাদী সংস্কৃতির প্রতীক।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবন—কিন্তু সৃষ্টির বিস্তারে তিনি হয়ে উঠেছেন শতাব্দীর একজন। জহির রায়হান তাই শুধু একটি নাম নয়, বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অনন্ত অধ্যায়।
