দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে চালু হওয়া ‘আনন্দ স্কুল’ (রস্ক-২) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ফেরত গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২১ কোটি ৮৯ লাখ ১ হাজার ৫৬৪ টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে গত জুনে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
২০১৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অনগ্রসর এলাকা, শহুরে বস্তি ও রোহিঙ্গা শিবিরের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা। তবে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, দুর্বল তদারকি, ভুয়া শিক্ষার্থী, ভূতুড়ে স্কুল এবং আর্থিক অনিয়মে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে।
ভ্রমণ ভাতা থেকে প্রকল্প তহবিলে অনিয়ম
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা প্রকৃত ভ্রমণ ছাড়াই ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করেছেন। এছাড়া জ্বালানি ও যাতায়াত ব্যয়ে বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রকল্পের তহবিল থেকে ১ কোটি টাকা অন্য একটি প্রকল্পে ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকে জমা সুদের ৫০ লাখ ২৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
কেনাকাটায় নিয়ম ভঙ্গ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণ না করে আইডি কার্ড ও প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনায় প্রায় ১৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পের শেষ সময়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্রয় পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে আরও ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়, যা প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভূতুড়ে স্কুল ও ভুয়া শিক্ষার্থী
সমীক্ষায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ভুয়া শিক্ষার্থী ও ভূতুড়ে লার্নিং সেন্টারের বিষয়টি। অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীকেই আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনিয়ম বাড়তে থাকায় প্রকল্প চলাকালেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫৮১টি আনন্দ স্কুল বা লার্নিং সেন্টার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ব্যর্থতায় ফেরত গেল ২২ কোটি টাকা
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করতে না পারায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর ১.৭৭ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
সোনালী ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ থেকে যথাযথভাবে ভ্যাট ও আয়কর না কাটায় সরকারের ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব ক্ষতির তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বহিঃনিরীক্ষায় ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, পিপিআর লঙ্ঘন ও অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বড় কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি বলে দাবি করা হয়েছিল।
আইএমইডির সুপারিশ
আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে ডিজিটাল আর্থিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি ব্যবহার করে সরাসরি উপবৃত্তি প্রদান এবং অডিট আপত্তির দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসি জানান, প্রতিবেদন হাতে পেলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে চালু হওয়া ‘আনন্দ স্কুল’ (রস্ক-২) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ফেরত গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২১ কোটি ৮৯ লাখ ১ হাজার ৫৬৪ টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে গত জুনে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
২০১৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অনগ্রসর এলাকা, শহুরে বস্তি ও রোহিঙ্গা শিবিরের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা। তবে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, দুর্বল তদারকি, ভুয়া শিক্ষার্থী, ভূতুড়ে স্কুল এবং আর্থিক অনিয়মে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে।
ভ্রমণ ভাতা থেকে প্রকল্প তহবিলে অনিয়ম
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা প্রকৃত ভ্রমণ ছাড়াই ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করেছেন। এছাড়া জ্বালানি ও যাতায়াত ব্যয়ে বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রকল্পের তহবিল থেকে ১ কোটি টাকা অন্য একটি প্রকল্পে ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকে জমা সুদের ৫০ লাখ ২৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
কেনাকাটায় নিয়ম ভঙ্গ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণ না করে আইডি কার্ড ও প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনায় প্রায় ১৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পের শেষ সময়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্রয় পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে আরও ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়, যা প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভূতুড়ে স্কুল ও ভুয়া শিক্ষার্থী
সমীক্ষায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ভুয়া শিক্ষার্থী ও ভূতুড়ে লার্নিং সেন্টারের বিষয়টি। অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীকেই আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনিয়ম বাড়তে থাকায় প্রকল্প চলাকালেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫৮১টি আনন্দ স্কুল বা লার্নিং সেন্টার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ব্যর্থতায় ফেরত গেল ২২ কোটি টাকা
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করতে না পারায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর ১.৭৭ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
সোনালী ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ থেকে যথাযথভাবে ভ্যাট ও আয়কর না কাটায় সরকারের ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব ক্ষতির তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বহিঃনিরীক্ষায় ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, পিপিআর লঙ্ঘন ও অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বড় কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি বলে দাবি করা হয়েছিল।
আইএমইডির সুপারিশ
আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে ডিজিটাল আর্থিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি ব্যবহার করে সরাসরি উপবৃত্তি প্রদান এবং অডিট আপত্তির দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসি জানান, প্রতিবেদন হাতে পেলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
