চেক পোস্ট

মূল পাতা

রাজনীতি

নির্বাচনে টুপি-ঘোমটা দিলে কি ভোট বাড়ে?

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
নির্বাচনে টুপি-ঘোমটা দিলে কি ভোট বাড়ে?
নির্বাচন এলেই রাজনীতির ভাষা বদলায়, বদলায় প্রার্থীদের আচরণ আর চোখে পড়ার মতোভাবে বদলায় পোশাক। উদারপন্থি থেকে বামপন্থি, আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় সব রাজনৈতিক ধারার প্রার্থীদের মধ্যেই এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের অভিন্ন প্রবণতা। টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা হয়ে উঠেছে নির্বাচনি জনসংযোগের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। শুধু পোশাক নয়, ধর্মকে সামনে এনে নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার, মাজার জিয়ারত কিংবা ধর্মীয় আবেগকে স্পর্শ করে বক্তব্য, এসবের নজির রয়েছে ধর্মভিত্তিক দল থেকে শুরু করে তথাকথিত উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ ভোটাররা রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, নির্বাচনি জনসংযোগে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং এবারের নির্বাচনে ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের অজ্ঞতা ও আবেগকেই রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের প্রধান কারণ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিবিসি বাংলার রিপোর্টার তানহা তাসনিমের করা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্ম ব্যবহার নিয়ে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী সেই নির্দেশনা অমান্য করলে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা হচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নির্বাচনি জনসংযোগে টুপি, পাঞ্জাবি ও ঘোমটা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও, বাস্তবে প্রার্থীদের জনসংযোগ শুরু হয়ে গেছে আরও আগে। বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের মসজিদ, শোকসভা কিংবা ধর্মীয় জমায়েতে দেখা গেছে বেশি। এসব স্থানে গিয়ে জনসংযোগ করতে গিয়ে পুরুষ প্রার্থীদের বেশিরভাগের মাথায় টুপি ও পরনে পাঞ্জাবি, আর নারী প্রার্থীদের মাথায় ঘোমটা চোখে পড়েছে। বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও এই প্রবণতা প্রায় একই রকম। তবে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সম্প্রতি তার জনসংযোগের সময় এক ব্যক্তি তাকে হঠাৎ করে প্রশ্ন করেন, নির্বাচনের সময় কেন টুপি-পাঞ্জাবি পরছেন। সেই মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নির্বাচন এলেই সমাজের প্রভাবশালী অংশ বিশেষ করে মসজিদ বা বাজার কমিটির সভাপতি ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ধর্মীয় চর্চায় বেশি মনোযোগী হন এবং টুপি-পাঞ্জাবি পরেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে এক ধরনের ‘কালচারাল জায়গা’ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভোটারদের বড় অংশই মুসলমান, তাই নির্বাচনে এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আগেও ধর্মীয় পোশাক পরতেন। তবে নির্বাচনের সময় ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করার অভিযোগও উঠছে তাদের বিরুদ্ধে।   ভোটাররা কী ভাবছেন ‘লেবাস রাজনীতি’ নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় পোশাক পরিবর্তন ভোটারদের চোখে কতটা গ্রহণযোগ্য—এ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ গত ১৩ জানুয়ারি তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, নির্বাচনের সময় টুপির ব্যবহার নতুন নয়। তার মতে, এতে যে কাজ হয় না, তা বলা যাবে না; না হলে এত ‘স্মার্ট’ প্রার্থীরা এই কৌশল নিতেন না। তবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ভোটারই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাজেদুজ্জামান সৌমিক বলেন, এটি এক ধরনের ভণ্ডামি। তার ভাষায়, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কিছু বিষয় গ্রহণযোগ্য হলেও লেবাস পরে ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করা কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রুমানা খাতুন মনে করেন, সচেতন ভোটাররা ব্যক্তি ও নীতি দেখে ভোট দেবেন। তবে গ্রামীণ এলাকায় ধর্মীয় মানসিকতার ভোটারদের ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজে দিতে পারে। নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক বলেন, এটি লোক দেখানোর রাজনীতি। তার মতে, নির্বাচন শেষ হলে প্রার্থীরা আবার আগের লেবাসে ফিরে যান। তিনি এমন প্রার্থীকে ভোট দেবেন না বলেও জানান। তবে সব ভোটার যে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমা আলম শান্তা বলেন, কেউ যদি ধর্মীয় লেবাস ধারণ করেও ভালো নির্বাচন করতে পারেন, তাহলে তাতে সমস্যা নেই।   কেন ধর্মীয় পোশাকের প্রতি ঝোঁক? প্রার্থীরা কেন ধর্মীয় পোশাকের দিকে ঝোঁকেন এই প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, ধর্মীয় পোশাক একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি করতে সাহায্য করে। অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি কিংবা ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকে। ধর্মীয় লেবাস সেই অভিযোগের আড়ালে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ার একটি কৌশল। তার মতে, এটি মূলত ভোটারদের আবেগকে স্পর্শ করার রাজনীতি।   অতীতেও ধর্ম ছিল রাজনীতির বড় হাতিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগই হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক শুরু থেকেই গভীর। আলতাফ পারভেজ তার লেখায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর টুপি পরার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তার মতে, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পর জিন্নাহ নিজে এবং দলের রাজনীতির মোড় বদলান। এরপর ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ধর্মীয় প্রতীক ও আবেগ বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পোস্টারে ‘আল্লাহু আকবর’সহ নানা ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও ১৯৭৫ সালের পর আবার ধর্ম রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে। জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত হয়। পরবর্তীতে এরশাদের আমলে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম ঘোষিত হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ধর্ম কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৩ সালের স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে এবারের জাতীয় নির্বাচনেও ধর্ম ব্যবহারের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ধর্মভিত্তিক দলের বিরুদ্ধে ভোটের নামে ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রির অভিযোগ উঠলেও দলগুলো তা অস্বীকার করেছে। টুপি, পাঞ্জাবি কিংবা ঘোমটা-এসব কি সত্যিই ভোট বাড়ায়? বিশ্লেষকদের মতে, এর কোনো সরল উত্তর নেই। সচেতন ভোটারের কাছে লেবাস নয়, ব্যক্তি, নীতি ও কর্মসূচিই মুখ্য। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এখনো শক্তিশালী একটি আবেগী হাতিয়ার। আর যতদিন ভোটারদের বড় একটি অংশ আবেগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে না আসবে, ততদিন নির্বাচনে টুপি-ঘোমটার রাজনীতিও টিকে থাকবে।  

চেক পোস্ট

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


নির্বাচনে টুপি-ঘোমটা দিলে কি ভোট বাড়ে?

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image
নির্বাচন এলেই রাজনীতির ভাষা বদলায়, বদলায় প্রার্থীদের আচরণ আর চোখে পড়ার মতোভাবে বদলায় পোশাক। উদারপন্থি থেকে বামপন্থি, আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় সব রাজনৈতিক ধারার প্রার্থীদের মধ্যেই এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের অভিন্ন প্রবণতা। টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা হয়ে উঠেছে নির্বাচনি জনসংযোগের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। শুধু পোশাক নয়, ধর্মকে সামনে এনে নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার, মাজার জিয়ারত কিংবা ধর্মীয় আবেগকে স্পর্শ করে বক্তব্য, এসবের নজির রয়েছে ধর্মভিত্তিক দল থেকে শুরু করে তথাকথিত উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ ভোটাররা রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, নির্বাচনি জনসংযোগে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং এবারের নির্বাচনে ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের অজ্ঞতা ও আবেগকেই রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের প্রধান কারণ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিবিসি বাংলার রিপোর্টার তানহা তাসনিমের করা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্ম ব্যবহার নিয়ে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী সেই নির্দেশনা অমান্য করলে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা হচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নির্বাচনি জনসংযোগে টুপি, পাঞ্জাবি ও ঘোমটা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও, বাস্তবে প্রার্থীদের জনসংযোগ শুরু হয়ে গেছে আরও আগে। বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের মসজিদ, শোকসভা কিংবা ধর্মীয় জমায়েতে দেখা গেছে বেশি। এসব স্থানে গিয়ে জনসংযোগ করতে গিয়ে পুরুষ প্রার্থীদের বেশিরভাগের মাথায় টুপি ও পরনে পাঞ্জাবি, আর নারী প্রার্থীদের মাথায় ঘোমটা চোখে পড়েছে। বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও এই প্রবণতা প্রায় একই রকম। তবে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সম্প্রতি তার জনসংযোগের সময় এক ব্যক্তি তাকে হঠাৎ করে প্রশ্ন করেন, নির্বাচনের সময় কেন টুপি-পাঞ্জাবি পরছেন। সেই মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নির্বাচন এলেই সমাজের প্রভাবশালী অংশ বিশেষ করে মসজিদ বা বাজার কমিটির সভাপতি ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ধর্মীয় চর্চায় বেশি মনোযোগী হন এবং টুপি-পাঞ্জাবি পরেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে এক ধরনের ‘কালচারাল জায়গা’ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভোটারদের বড় অংশই মুসলমান, তাই নির্বাচনে এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আগেও ধর্মীয় পোশাক পরতেন। তবে নির্বাচনের সময় ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করার অভিযোগও উঠছে তাদের বিরুদ্ধে।   ভোটাররা কী ভাবছেন ‘লেবাস রাজনীতি’ নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় পোশাক পরিবর্তন ভোটারদের চোখে কতটা গ্রহণযোগ্য—এ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ গত ১৩ জানুয়ারি তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, নির্বাচনের সময় টুপির ব্যবহার নতুন নয়। তার মতে, এতে যে কাজ হয় না, তা বলা যাবে না; না হলে এত ‘স্মার্ট’ প্রার্থীরা এই কৌশল নিতেন না। তবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ভোটারই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাজেদুজ্জামান সৌমিক বলেন, এটি এক ধরনের ভণ্ডামি। তার ভাষায়, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কিছু বিষয় গ্রহণযোগ্য হলেও লেবাস পরে ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করা কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রুমানা খাতুন মনে করেন, সচেতন ভোটাররা ব্যক্তি ও নীতি দেখে ভোট দেবেন। তবে গ্রামীণ এলাকায় ধর্মীয় মানসিকতার ভোটারদের ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজে দিতে পারে। নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক বলেন, এটি লোক দেখানোর রাজনীতি। তার মতে, নির্বাচন শেষ হলে প্রার্থীরা আবার আগের লেবাসে ফিরে যান। তিনি এমন প্রার্থীকে ভোট দেবেন না বলেও জানান। তবে সব ভোটার যে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমা আলম শান্তা বলেন, কেউ যদি ধর্মীয় লেবাস ধারণ করেও ভালো নির্বাচন করতে পারেন, তাহলে তাতে সমস্যা নেই।   কেন ধর্মীয় পোশাকের প্রতি ঝোঁক? প্রার্থীরা কেন ধর্মীয় পোশাকের দিকে ঝোঁকেন এই প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, ধর্মীয় পোশাক একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি করতে সাহায্য করে। অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি কিংবা ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকে। ধর্মীয় লেবাস সেই অভিযোগের আড়ালে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ার একটি কৌশল। তার মতে, এটি মূলত ভোটারদের আবেগকে স্পর্শ করার রাজনীতি।   অতীতেও ধর্ম ছিল রাজনীতির বড় হাতিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগই হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক শুরু থেকেই গভীর। আলতাফ পারভেজ তার লেখায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর টুপি পরার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তার মতে, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পর জিন্নাহ নিজে এবং দলের রাজনীতির মোড় বদলান। এরপর ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ধর্মীয় প্রতীক ও আবেগ বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পোস্টারে ‘আল্লাহু আকবর’সহ নানা ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও ১৯৭৫ সালের পর আবার ধর্ম রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে। জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত হয়। পরবর্তীতে এরশাদের আমলে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম ঘোষিত হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ধর্ম কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৩ সালের স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে এবারের জাতীয় নির্বাচনেও ধর্ম ব্যবহারের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ধর্মভিত্তিক দলের বিরুদ্ধে ভোটের নামে ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রির অভিযোগ উঠলেও দলগুলো তা অস্বীকার করেছে। টুপি, পাঞ্জাবি কিংবা ঘোমটা-এসব কি সত্যিই ভোট বাড়ায়? বিশ্লেষকদের মতে, এর কোনো সরল উত্তর নেই। সচেতন ভোটারের কাছে লেবাস নয়, ব্যক্তি, নীতি ও কর্মসূচিই মুখ্য। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এখনো শক্তিশালী একটি আবেগী হাতিয়ার। আর যতদিন ভোটারদের বড় একটি অংশ আবেগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে না আসবে, ততদিন নির্বাচনে টুপি-ঘোমটার রাজনীতিও টিকে থাকবে।  

চেক পোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত