বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

জাতীয়

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় কারাগারে ‘জুলাই যোদ্ধা’ রিয়াজ

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় কারাগারে ‘জুলাই যোদ্ধা’ রিয়াজ
ছবি: চেকপোস্ট

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে সাভারের রাজপথে আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে দেখা গিয়েছিল মেহেদী হাসান রিয়াজকে। সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলি ও টিয়ারশেলের মধ্যেও তিনি আন্দোলনকারীদের পাশে ছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলনেরই একটি হত্যা মামলায় এখন তিনি আসামি। গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এই ‘জুলাই যোদ্ধা’।

সাভার মডেল থানায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় রিয়াজসহ ১৫৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার বাদী জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা নিপু আলী। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাভারের রেজিস্ট্রি অফিস মোড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সুমন হাসান। এ ঘটনায় রিয়াজসহ অন্যদের দায়ী করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে সুমন নিহত হন। তবে সেই মামলাতেই রিয়াজকে আসামি করা হয়েছে।

থানা সূত্র জানায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গত ১৪ জুলাই নিয়মিত অভিযানে রিয়াজকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে পাঠানোর নথিতে তার রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) চম্পক বড়ুয়া বলেন, “এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় নিয়মিত অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।”

তবে অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। আন্দোলনকারীদের সাক্ষাৎকার এবং একাধিক ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে রিয়াজ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সাভার নিউমার্কেটের ভূগর্ভস্থ ‘আদিল এক্সপোর্ট’ নামের একটি পোশাকের দোকানে তিনি দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৩ জুলাই কর্মস্থল থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে।

দোকানের মালিক মো. ইব্রাহিম বলেন, “রিয়াজ দীর্ঘদিন ধরে আমার দোকানে কাজ করছে। সে অত্যন্ত শান্ত-স্বভাবের এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কখনও দেখিনি। দোকান থেকেই পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।”

রিয়াজের সহযোদ্ধা মেহেদী হাসান মুন্নার দাবি, ১৮ জুলাই সাভারে গুলি ও টিয়ারশেলের মধ্যে রিয়াজ সামনের সারিতে ছিলেন। আন্দোলনকারীদের সহায়তায় টিয়ারগ্যাসের প্রভাব কমাতে আগুন জ্বালানোর কাজও করেছিলেন তিনি।

রিয়াজের বোন মরিয়ম বলেন, “আমরা দুই ভাই-বোনই আন্দোলনে গিয়েছিলাম। ১৯ জুলাইও আমার ভাই রাজপথে ছিল। সে নির্দোষ। তার উপার্জনের টাকায় আমাদের পড়াশোনা ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসা চলে। সঠিক তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, “যদি তিনি সত্যিই জুলাই আন্দোলনের একজন অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকেন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়িয়ে থাকেন, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর আলোকে এ ধরনের হয়রানির বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।”

রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন মনা অভিযোগ করেন, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে তার দুই ছেলেকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার দাবি, সাভার পৌরসভার সাবেক এক আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই প্রতিপক্ষ এই মামলা সাজিয়েছে।

অন্যদিকে, সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার যদি আদালতে প্রয়োজনীয় নথি ও আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রমাণ উপস্থাপন করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা হবে। কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—যে ব্যক্তি আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বলে সহযোদ্ধারা দাবি করছেন, তিনি কীভাবে একই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় আসামি হলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।

চেকপোস্ট

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় কারাগারে ‘জুলাই যোদ্ধা’ রিয়াজ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে সাভারের রাজপথে আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে দেখা গিয়েছিল মেহেদী হাসান রিয়াজকে। সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলি ও টিয়ারশেলের মধ্যেও তিনি আন্দোলনকারীদের পাশে ছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলনেরই একটি হত্যা মামলায় এখন তিনি আসামি। গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এই ‘জুলাই যোদ্ধা’।

সাভার মডেল থানায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় রিয়াজসহ ১৫৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার বাদী জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা নিপু আলী। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাভারের রেজিস্ট্রি অফিস মোড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সুমন হাসান। এ ঘটনায় রিয়াজসহ অন্যদের দায়ী করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে সুমন নিহত হন। তবে সেই মামলাতেই রিয়াজকে আসামি করা হয়েছে।

থানা সূত্র জানায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গত ১৪ জুলাই নিয়মিত অভিযানে রিয়াজকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে পাঠানোর নথিতে তার রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) চম্পক বড়ুয়া বলেন, “এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় নিয়মিত অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।”

তবে অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। আন্দোলনকারীদের সাক্ষাৎকার এবং একাধিক ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে রিয়াজ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সাভার নিউমার্কেটের ভূগর্ভস্থ ‘আদিল এক্সপোর্ট’ নামের একটি পোশাকের দোকানে তিনি দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৩ জুলাই কর্মস্থল থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে।

দোকানের মালিক মো. ইব্রাহিম বলেন, “রিয়াজ দীর্ঘদিন ধরে আমার দোকানে কাজ করছে। সে অত্যন্ত শান্ত-স্বভাবের এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কখনও দেখিনি। দোকান থেকেই পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।”

রিয়াজের সহযোদ্ধা মেহেদী হাসান মুন্নার দাবি, ১৮ জুলাই সাভারে গুলি ও টিয়ারশেলের মধ্যে রিয়াজ সামনের সারিতে ছিলেন। আন্দোলনকারীদের সহায়তায় টিয়ারগ্যাসের প্রভাব কমাতে আগুন জ্বালানোর কাজও করেছিলেন তিনি।

রিয়াজের বোন মরিয়ম বলেন, “আমরা দুই ভাই-বোনই আন্দোলনে গিয়েছিলাম। ১৯ জুলাইও আমার ভাই রাজপথে ছিল। সে নির্দোষ। তার উপার্জনের টাকায় আমাদের পড়াশোনা ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসা চলে। সঠিক তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, “যদি তিনি সত্যিই জুলাই আন্দোলনের একজন অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকেন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়িয়ে থাকেন, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর আলোকে এ ধরনের হয়রানির বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।”

রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন মনা অভিযোগ করেন, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে তার দুই ছেলেকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার দাবি, সাভার পৌরসভার সাবেক এক আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই প্রতিপক্ষ এই মামলা সাজিয়েছে।

অন্যদিকে, সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার যদি আদালতে প্রয়োজনীয় নথি ও আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রমাণ উপস্থাপন করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা হবে। কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—যে ব্যক্তি আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বলে সহযোদ্ধারা দাবি করছেন, তিনি কীভাবে একই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় আসামি হলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত