শ্রাবণের নীরব রাত। আকাশজুড়ে পূর্ণিমার চাঁদ, চারপাশে মৃদু বাতাস। সেই চাঁদের আলো আর মাঠজুড়ে স্থাপিত বৈদ্যুতিক আলোর মিশ্রণে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ যেন এক প্রাকৃতিক স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসে ফুটবলপ্রেমী তরুণদের উল্লাস, বাঁশির শব্দ, গোলের আনন্দ আর বন্ধুদের হাসির প্রতিধ্বনি। মুহূর্তেই মনে হয়, এটি শুধুই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ নয়; বরং প্রাণ, বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা ও তারুণ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।
রাত প্রায় ১টা বাজে। অধিকাংশ মানুষের দিনের সমাপ্তি হলেও কুবির কেন্দ্রীয় মাঠ তখনও সজীব। দিনের বেলায় ক্লাস, টিউশন কিংবা অন্যান্য ব্যস্ততায় খেলার সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই রাতেই জড়ো হন মাঠে। কেউ বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে, কেউবা নিছক বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে ফুটবল নিয়ে নেমে পড়েন সবুজ ঘাসে।
মাঠে তখন জমে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাস, ড্রিবলিংয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, শেষ মুহূর্তে সতীর্থের উদ্দেশে বাড়ানো বল আর জোরালো শটে জালে বল জড়াতেই চারদিকে উল্লাস। গোল উদযাপনে পুরো মাঠ মুখর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে শুরু হয় মজার খুনসুটিনকার ভুলে গোল হলো, কে ডিফেন্সে ঠিকমতো মার্কিং করেনি। তবে এই দোষারোপে নেই কোনো তিক্ততা; বরং পরের গোলের জন্য নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণাই যেন এতে লুকিয়ে থাকে।
এই মাঠে শুধু ফুটবল খেলা হয় না; গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্বের গুণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিখছেন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং দলগতভাবে লক্ষ্য অর্জনের কৌশল। একই সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলা তাদের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি মাদকসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকেও দূরে রাখছে।
শিক্ষার্থীদের অনুভূতি জানতে চাইলে অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাফি বলেন, 'আমাদের ক্যাম্পাসের রাত যেন অন্য এক পৃথিবী। চারদিকে আলো, বন্ধুদের হাসি আর মাঠজুড়ে খেলার উচ্ছ্বাসে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। দিনের ক্লান্তি ভুলে সবাই খেলায় মেতে ওঠে। এই রাতগুলো শুধু খেলার নয়, বন্ধুত্ব, আনন্দ আর অসংখ্য সুন্দর স্মৃতিরও সাক্ষী। এমন রাত বারবার ফিরে আসুক আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে।'
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাতুল ইসলাম শাওয়াল বলেন, 'আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সেন্ট্রাল ফিল্ডে কখনো লাইটের ব্যবস্থা দেখিনি। ফলে সন্ধ্যা নামলেই মাঠ কার্যত অন্ধকার হয়ে যেত এবং খেলাধুলার সুযোগ সীমিত ছিল। সম্প্রতি মাঠে লাইট স্থাপন করায় পুরো পরিবেশটাই বদলে গেছে। এখন আমরা রাতেও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটবল খেলতে পারছি। এতে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে এবং ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্যও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।'
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস ক্লাবের সভাপতি এইচ. এম. পিয়াস বলেন, 'কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নৈশকালীন আলোর ব্যবস্থা করায় বর্তমান প্রশাসনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিকেলে টিউশন বা একাডেমিক পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খেলতে পারতেন না। শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে আমরা আগেও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় মাঠে আলোর ব্যবস্থা করায় এখন রাতেও নিরাপদে খেলাধুলা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ক্যাম্পাসের ক্রীড়া সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশা করছি।'
দিনের ব্যস্ততা শেষে রাতের কুবি সেন্ট্রাল ফিল্ড এখন শুধু একটি খেলার মাঠ নয়; এটি শিক্ষার্থীদের প্রাণের ঠিকানা। এখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন বন্ধুত্ব, নতুন গল্প আর অসংখ্য স্মৃতি। পূর্ণিমার আলো, আলোকিত মাঠ আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে কুবির রাত যেন প্রতিদিনই লিখে যাচ্ছে এক একটি নতুন স্পোর্টসম্যানশিপের গল্প।

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
শ্রাবণের নীরব রাত। আকাশজুড়ে পূর্ণিমার চাঁদ, চারপাশে মৃদু বাতাস। সেই চাঁদের আলো আর মাঠজুড়ে স্থাপিত বৈদ্যুতিক আলোর মিশ্রণে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ যেন এক প্রাকৃতিক স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসে ফুটবলপ্রেমী তরুণদের উল্লাস, বাঁশির শব্দ, গোলের আনন্দ আর বন্ধুদের হাসির প্রতিধ্বনি। মুহূর্তেই মনে হয়, এটি শুধুই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ নয়; বরং প্রাণ, বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা ও তারুণ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।
রাত প্রায় ১টা বাজে। অধিকাংশ মানুষের দিনের সমাপ্তি হলেও কুবির কেন্দ্রীয় মাঠ তখনও সজীব। দিনের বেলায় ক্লাস, টিউশন কিংবা অন্যান্য ব্যস্ততায় খেলার সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই রাতেই জড়ো হন মাঠে। কেউ বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে, কেউবা নিছক বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে ফুটবল নিয়ে নেমে পড়েন সবুজ ঘাসে।
মাঠে তখন জমে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাস, ড্রিবলিংয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, শেষ মুহূর্তে সতীর্থের উদ্দেশে বাড়ানো বল আর জোরালো শটে জালে বল জড়াতেই চারদিকে উল্লাস। গোল উদযাপনে পুরো মাঠ মুখর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে শুরু হয় মজার খুনসুটিনকার ভুলে গোল হলো, কে ডিফেন্সে ঠিকমতো মার্কিং করেনি। তবে এই দোষারোপে নেই কোনো তিক্ততা; বরং পরের গোলের জন্য নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণাই যেন এতে লুকিয়ে থাকে।
এই মাঠে শুধু ফুটবল খেলা হয় না; গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্বের গুণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিখছেন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং দলগতভাবে লক্ষ্য অর্জনের কৌশল। একই সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলা তাদের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি মাদকসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকেও দূরে রাখছে।
শিক্ষার্থীদের অনুভূতি জানতে চাইলে অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাফি বলেন, 'আমাদের ক্যাম্পাসের রাত যেন অন্য এক পৃথিবী। চারদিকে আলো, বন্ধুদের হাসি আর মাঠজুড়ে খেলার উচ্ছ্বাসে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। দিনের ক্লান্তি ভুলে সবাই খেলায় মেতে ওঠে। এই রাতগুলো শুধু খেলার নয়, বন্ধুত্ব, আনন্দ আর অসংখ্য সুন্দর স্মৃতিরও সাক্ষী। এমন রাত বারবার ফিরে আসুক আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে।'
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাতুল ইসলাম শাওয়াল বলেন, 'আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সেন্ট্রাল ফিল্ডে কখনো লাইটের ব্যবস্থা দেখিনি। ফলে সন্ধ্যা নামলেই মাঠ কার্যত অন্ধকার হয়ে যেত এবং খেলাধুলার সুযোগ সীমিত ছিল। সম্প্রতি মাঠে লাইট স্থাপন করায় পুরো পরিবেশটাই বদলে গেছে। এখন আমরা রাতেও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটবল খেলতে পারছি। এতে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে এবং ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্যও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।'
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস ক্লাবের সভাপতি এইচ. এম. পিয়াস বলেন, 'কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নৈশকালীন আলোর ব্যবস্থা করায় বর্তমান প্রশাসনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিকেলে টিউশন বা একাডেমিক পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খেলতে পারতেন না। শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে আমরা আগেও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় মাঠে আলোর ব্যবস্থা করায় এখন রাতেও নিরাপদে খেলাধুলা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ক্যাম্পাসের ক্রীড়া সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশা করছি।'
দিনের ব্যস্ততা শেষে রাতের কুবি সেন্ট্রাল ফিল্ড এখন শুধু একটি খেলার মাঠ নয়; এটি শিক্ষার্থীদের প্রাণের ঠিকানা। এখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন বন্ধুত্ব, নতুন গল্প আর অসংখ্য স্মৃতি। পূর্ণিমার আলো, আলোকিত মাঠ আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে কুবির রাত যেন প্রতিদিনই লিখে যাচ্ছে এক একটি নতুন স্পোর্টসম্যানশিপের গল্প।
