সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

আরও

সংকুচিত হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

এশিয়াজুড়ে বাড়ছে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিপীড়ন

এশিয়াজুড়ে বাড়ছে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিপীড়ন
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে সংকটে পড়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ, অনলাইন নজরদারি, মামলা ও সহিংসতার কারণে সাংবাদিকরা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

মিয়ানমার, চীন ও আফগানিস্তানে সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার দমননীতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত বিপর্যস্ত। এপ্রিলে অন্তত তিনটি সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো বহু সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন।

চীনে বর্তমানে ১৩৪ জনের বেশি সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী কারাবন্দি বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন। বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ ও চলাচলে বাধা বাড়ছে। রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন সেন্সরের আওতায় আনা হয়েছে।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। আফগানিস্তান জার্নালিস্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০০-র বেশি হুমকি, গ্রেপ্তার ও সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে। মার্চে রাহে-ফারদা টিভি ও রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ করে সম্পত্তি জব্দ করা হয়। জীবন্ত প্রাণীর ছবি সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু টিভি চ্যানেল কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, আফগান সাংবাদিকরা নিয়মিত ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছেন।

পাকিস্তান, ভারত ও ফিলিপাইনে চাপ অব্যাহত

পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাইবার আইন ও নিরাপত্তা বাহিনীর চাপে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। মার্চে নারী দিবসের মিছিল কভার করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আটক হন। এপ্রিলে সিনিয়র সাংবাদিক ফখর-উর-রেহমানকে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বেড়েছে। মার্চ-এপ্রিলে অন্তত ১৯ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও সহিংসতা কভার করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন।

ফিলিপাইনে পরিস্থিতি আরও প্রাণঘাতী। মার্চে রেডিও সাংবাদিক হুলিতো দিয়ামান্তে কালো গুলিতে নিহত হন। এপ্রিলেও এক কমিউনিটি সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের রেড-ট্যাগিং ও মামলার ঘটনাও বাড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারি ও কারাবন্দি

সৌদি আরবে সমালোচনামূলক মত প্রকাশকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ আইনে সাংবাদিক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে অন্তত ২৩ সাংবাদিক কারাবন্দি বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানে মিডিয়া ব্ল্যাকআউট, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। সিরিয়ায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত, তবে উদ্বেগ রয়েছে

বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিলে সাংবাদিক হত্যা বা বড় ধরনের হামলার ঘটনা না ঘটলেও আত্মসেন্সরশিপ ও সংবাদ ব্ল্যাকআউটের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্র মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তথ্যমন্ত্রী জহিরুদ্দিন স্বপন সাংবাদিক সুরক্ষা আইন ও সাংবাদিক কল্যাণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

তবে ২৪ এপ্রিল শাহবাগে সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকজন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া দুই সাংবাদিককে আটক এবং দুজনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অনেক দেশ সাংবিধানিকভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিবিষয়ক সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। উত্তর কোরিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় দেশটিকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক সংবাদ পরিবেশগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

#সাংবাদিক_নিরাপত্তা #মতপ্রকাশের_স্বাধীনতা #সংবাদমাধ্যম

চেকপোস্ট

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


এশিয়াজুড়ে বাড়ছে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিপীড়ন

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে সংকটে পড়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ, অনলাইন নজরদারি, মামলা ও সহিংসতার কারণে সাংবাদিকরা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।


মিয়ানমার, চীন ও আফগানিস্তানে সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার দমননীতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত বিপর্যস্ত। এপ্রিলে অন্তত তিনটি সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো বহু সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন।

চীনে বর্তমানে ১৩৪ জনের বেশি সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী কারাবন্দি বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন। বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ ও চলাচলে বাধা বাড়ছে। রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন সেন্সরের আওতায় আনা হয়েছে।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। আফগানিস্তান জার্নালিস্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০০-র বেশি হুমকি, গ্রেপ্তার ও সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে। মার্চে রাহে-ফারদা টিভি ও রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ করে সম্পত্তি জব্দ করা হয়। জীবন্ত প্রাণীর ছবি সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু টিভি চ্যানেল কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, আফগান সাংবাদিকরা নিয়মিত ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছেন।


পাকিস্তান, ভারত ও ফিলিপাইনে চাপ অব্যাহত

পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাইবার আইন ও নিরাপত্তা বাহিনীর চাপে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। মার্চে নারী দিবসের মিছিল কভার করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আটক হন। এপ্রিলে সিনিয়র সাংবাদিক ফখর-উর-রেহমানকে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বেড়েছে। মার্চ-এপ্রিলে অন্তত ১৯ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও সহিংসতা কভার করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন।

ফিলিপাইনে পরিস্থিতি আরও প্রাণঘাতী। মার্চে রেডিও সাংবাদিক হুলিতো দিয়ামান্তে কালো গুলিতে নিহত হন। এপ্রিলেও এক কমিউনিটি সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের রেড-ট্যাগিং ও মামলার ঘটনাও বাড়ছে।


মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারি ও কারাবন্দি

সৌদি আরবে সমালোচনামূলক মত প্রকাশকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ আইনে সাংবাদিক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে অন্তত ২৩ সাংবাদিক কারাবন্দি বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানে মিডিয়া ব্ল্যাকআউট, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। সিরিয়ায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।


বাংলাদেশে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত, তবে উদ্বেগ রয়েছে

বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিলে সাংবাদিক হত্যা বা বড় ধরনের হামলার ঘটনা না ঘটলেও আত্মসেন্সরশিপ ও সংবাদ ব্ল্যাকআউটের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্র মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তথ্যমন্ত্রী জহিরুদ্দিন স্বপন সাংবাদিক সুরক্ষা আইন ও সাংবাদিক কল্যাণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

তবে ২৪ এপ্রিল শাহবাগে সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকজন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া দুই সাংবাদিককে আটক এবং দুজনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।


বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অনেক দেশ সাংবিধানিকভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিবিষয়ক সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। উত্তর কোরিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় দেশটিকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক সংবাদ পরিবেশগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত