হাওরে ধানের দামে ধস, ৬৫০ টাকায় বিক্রি-১৪৮০ টাকার সুপারিশ
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ডুমরা গ্রামের কৃষক সুধাকর দাস। এই বছর তিনি ছায়া ও ভেরাডহর হাওরে ৩০ কিয়ার (প্রতি কিয়ার সমান ৩০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। প্রতি কিয়ার জমিতে প্রায় ২০ মণ করে ফলন হয়েছে। গেল সপ্তাহে তিনি ২৯০ মণ ভেজা ধান বিক্রি করেছেন ৬৩০ টাকা দরে। এই সপ্তাহে ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকা করে। এভাবেই হাওরের পাড়ে ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে বোরো ধান।
সুধাকর দাস বলেন, কৃষকরা ধান চাষ করে লোকসান গুনছেন। সার-বীজ, ডিজেলের মূল্য ও শ্রমিকের মুজুরি বেশি কিন্তু ধানের দাম অনেক কম। সরকারিভাবে বোরো ধানের দাম ঘোষণা না হওয়ায় এই বছর ধানের দাম নেই, ধানের পাইকারও কম। আবহাওয়া ভাল না থাকায় শুকনোর দুর্ভোগের কারণে আমি ২৯০ মণ ৬৩০ টাকা বিক্রি করেছি। গত বছর এই সময়ে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা মণ ছিল। কিন্তু এই বছর প্রতি মণে ২০০ টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে।
তবে সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, গেল বছর থেকে বোরো ধানের মূল্য প্রতি কেজিতে ১ টাকা বৃদ্ধি করে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৭ টাকা করে ১৪৮০ টাকা মণ নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
শাল্লা উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুস ছাত্তার বলেন, ১০০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ইতোমধ্যে ১৫ বিঘা জমির কেটেছি কিন্তু নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ার কারণে ধান মাড়াই ও শুকাতে পারছি না। রোদের অভাবে অন্তত ২৫০ মণ ধান নষ্ট হওয়ার পথে। ধানের দাম নেই, ভেজা ধান মাত্র ৬৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এমন দুর্যোগ ও দুর্ভোগের বৈশাখী গত কয়েক বছরেও দেখিনি। বৈশাখের শুরু থেকে নিয়মিত ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার রোদের অভাবে ভেজা ধান শুকানো নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকেরা। বোরো ধান কাটার পর মজুদ করে রাখা বা অটোমেটিক রাইস মিলে প্রক্রিয়া করার সুযোগ নেই অধিকাংশ হাওরের কৃষকদের, তাই ৬৫০ টাকা মণ করেই ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়মিত ঝড়-বৃষ্টি হওয়ায় ও পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় বোরো ধান কাটার পর মাড়াই করা ও শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। যদিও গতকাল মঙ্গলবার রোদের দেখা মিলেছে সুনামগঞ্জের আকাশে। তবে গত ৩-৪ দিন টানা হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধান শুকানোর খলা ভেজা থাকায় কোন কৃষকই ভাল করে ধান শুকাতে পারেননি।
এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সুনামগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা, কুশিয়ারা, বৌলাইসহ অন্যান্য নদীর উজান অববাহিকায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী কয়েক দিন নদ-নদীর পানি সমতল এলাকায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেকোন সময় আগাম বন্যার পরিস্থিতি উদ্ভব হতে পারে।
এছাড়া বৃষ্টিপাতের কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধার সৃষ্টি হতে পারে। তাই বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে যেসব জমির ৮০ ভাগ ধান পাকা রয়েছে সেই জমির ধান দ্রুত কেটে তোলার অনুরোধ জানিয়েছে পাউবো।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার বলেন,আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সুনামগঞ্জ অঞ্চলে আগামী দুই-তিন দিন হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে, এরপর ভারী বৃষ্টির সম্ভবনা রয়েছে। সুরমা নদীর পানি যদিও বিপৎসীমার ২.৫৪ সেন্টিার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবে গতকাল নদীর পানি ৭৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই হাওরের পাকা ধান দ্রুত কাটার জন্য আমরা কৃষকদের অনুরোধ জানিয়েছি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার সদর উপজেলায় ৪টি, জামালগঞ্জে ১টি, শান্তিগঞ্জে ২টি, বিশ্বম্ভরপুর ১টি ও জগন্নাথপুর উপজেলায় ২ অটোমেটিক রাইসমিল রয়েছে। যেগুলোতে ভেজা ধান প্রক্রিয়া করে আতপ ও সেদ্ধ চাল করা যায়। কিন্তু সবগুলো মিল হাওর থেকে দূরে হওয়ায় পরিবহন জটিলতায় কৃষকরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হ।
এদিকে ধানের দাম নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেছেন, ধানের উৎপাদন খরচ ১ হাজার টাকা কিন্তু কৃষকদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ টাকা মণ করে। তিনি ধানের মূল্য বৃদ্ধির জন্য খাদ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, হাওরে বোরো ধান চাষাবাদে অনেক ঝুঁকি, ব্যয়ও বেশি। প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচই ১ হাজার টাকা, কিন্ত হাওরে এক ধান শুকনো বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা করে। তাই সরকারিভাবে ধানের মূল্য প্রায় ১৫০০ টাকা নির্ধারণ করার জন্য আমি খাদ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করে জাতীয় সংসদে কথা বলেছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মওসুমে সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। হাওরের বোরো ধান কাটার জন্য জেলার ১০ লাখ কৃষকের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার কৃষি শ্রমিক এসেছেন। জেলায় ধান কাটার যন্ত্র ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬ টি রিপার রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আরও ২৫ টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার এনেছেন কৃষকেরা। আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
দিরাইয়ের বরাম হাওরপাড়ের মার্কুলী গ্রামের কৃষক দ্বীন ইসলাম মাসুদ বলেন, ১২ কিয়ার জমিতে প্রায় ১৮০ মণ পেয়েছি। কিন্তু এই বছর ধানের দাম নেই, পাইকারও কম। হাওরে এখন ধানের দাম মাত্র ৬৫০ টাকা মণ। আমার এলাকায় যোগাযোগ ভাল থাকায় আমি ৬৭০ টাকা মণ দরে ১০০ মণ বিক্রি করেছি। অথচ গত বছর এই সময়ে ভেজা ধানই ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা করে মণ বিক্রি হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার পাটাবুকা গ্রামের কৃষক রিপচান হাবিব বলেন, প্রতি বিঘা জমি চাষাবাদের খরচ প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এক বিঘায় ধান পাওয়া যায় ১৫-১৬ মণ, কোন কোন জমিতে হয়ত একটু বেশি হয়। ধানের উৎপাদন খরচ ১ হাজার কিন্তু শুকনো ধান ৮০০ টাকা মণ করে বিক্রি হচ্ছে, অথচ গেল বছর ১ হাজার টাকা করে বিক্রি করা গেছে। এলাকায় কোন অটোমেটিক রাইসমিল না থাকায় ধান বিক্রি বা প্রক্রিয়া করে চাল বিক্রির সুযোগ নেই।
আব্দুর রহিম নামের এক ধানের পাইকার বলেন, আশুগঞ্জের বড় অটোমেটিক রাইসমিল ও আড়তেই বোরো ধানের চাহিদা কম। তাই এই বছর ধানের দাম কম। এছাড়া আবহাওয়া ভাল না থাকায় এবারের ধানের মানও ভাল না। তাই কৃষকরা গত বছরের চেয়ে দাম কম পাচ্ছেন। ধানের মান অনুযায়ী ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা মণ করে কিনছি আমরা।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এবছর ধানের ভাল ফলন হয়েছে, তবে প্রকৃতি এই বছর কৃষকদের সাথে বৈরী আচরণ করছে। যার কারণে ধান কাটা ও শুকাতে কষ্ট হচ্ছে। সরকারিভাবে ধানের দাম নির্ধারণ না হওয়ায় কৃষকরা মাঠ পর্যায়ে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে ভেজা ধান বিক্রি করছেন। ধানের দাম নির্ধারণ ও কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের বিষয়ে জেলা খাদ্য বিভাগের সাথে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছেন দু’একদিনের মধ্যে জানা যাবে।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) এবিএম মুশফিকুর রহমান বলেন,‘ আমরা স্থানীয় কৃষকদের সাথে আলাপ করে সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি ব্যয় বিবেচনা করে গেল বছর থেকে ১ টা বৃদ্ধি করে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৭ টাকা নির্ধারণের জন্য অনুরোধ করেছি। ধানের মূল্য নির্ধারণ ও কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের বিষয়ে আজ বুধবার মন্ত্রণালয়ে সভা হবে। সভার সিদ্ধান্তের পর জানা যাবে ধানের মূল্য ও সুনামগঞ্জ জেলা থেকে কত জন কৃষকের কাছ থেকে কত মণ ধান ক্রয় করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলার ৫টি উপজেলায় ১১টি অটোমেটিক রাইসমিল রয়েছে। কৃষকরা ইচ্ছে করলে মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে ধান নিয়ে চাল তৈরি করে বিক্রি করতে পারেন।
সুনামগঞ্জ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাসেল আহমদ বলেন, প্রতি আমন ও বোরো মৌসুমে চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে আমরা আতপ ও সেদ্ধ চাল সরবরাহ করে থাকি। সরকারকে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে অন্য কোন কাজ করার সময় পাওয়া যায় না। সময় ও সুযোগ থাকলে কৃষকের ভেজা ধানকে প্রক্রিয়া করে চাল তৈরি করে দেওয়া যেত।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত