খুলনা সিটি কর্পোরেশনে খাল খনন, সড়ক ও ড্রেন নির্মানের চেক নিতে ঘুষ বাধ্যতামুলক
প্রকাশের তারিখ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
খুলনা নগর জুড়ে চলছে খুলনা সিটি করপোরেশনের ( কেসিসি) উন্নয়ন কাজ। নির্মান কাজের পেছনে প্রতি বছর কেসিসির খরচ হচ্ছে প্রায় শত কেটি টাকা। কাজের এই বিল তুলতে আধা শতাংশ হারে ঘুষ দিতে হচ্ছে ঠিকাদারকে। গত তিন মাস ধরে চলছে এই অবস্থা।
ভুক্তভোগীরা জানান, শুনতে অবাক লাগলেও নগর ভবনে এটি ওপেন সিক্রেট। কেসিসিতে কর্মরত প্রকৌশলী, কার্যসহকারী, অফিস সহায়ক, পিয়ন,সবাই এটা জানেন। চেক নিতে বাধ্য হয়েই তারা অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিচ্ছেন। তারা জানেন কেসিসির শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে পুর্ত বিভাগে এই টাকা জমা রাখা হয়। পরে আরেক শীর্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমেই নগদ টাকা লেনদেন হয়। টাকা দেওয়ার পরের দিন চেক হাতে পান ঠিকাদাররা। কাংখিত টাকা না দেওয়ায় বিলের জন্য মাসের পর মাস ঘুরছেন অনেকে।
কেসিসিতে কাজ করা ঠিকাদারার জানান, কাজ শেষে বিল তৈরি ও উত্তোলনের জন্য একটি নির্ধারিত অংকের টাকা অফিস খরচ হিসেবে ব্যয় করা হয়। এটি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। বিগত সব মেয়রের সময়ই গোপনে সমঝোতার ভিত্তিতে এই লেনদেন হয়েছে। এটা নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ নেই।
তবে হাতে গোনা কয়েকজন প্রকৌশলী এবং সরকারি কর্মকর্তা এই টাকা নিতেন না। বিশেষ করে কেসিসির বর্তমান ও বিদায়ী কয়েকজন প্রধান নির্বাহী, সচিব, ম্যাজিস্ট্রেট কোন ধরনের অনৈতিক লেনদেনে জড়াননি। চেক নিতে নির্ধারিত হারে টাকা বাধ্যতামুলক ঘুষ দিতে হয়নি কাউকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার জানান, গত নভেম্বর মাস থেকে ঘুষের এই ধারা শুরু হয়৷ পুরো নভেম্বর এবং ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত কেউ কোন বিল পাননি। নানা অজুহাতে বিল ফিরিয়ে দেওয়া হয়। চলতি বিলের টাকা না পেয়ে অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন শীর্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে আধা শতাংশ হারে ঘুষ দিয়ে বিল ছাড়ানো শুরু হয়। নগরীর একটি নদী ও খাল খননের সঙ্গে জড়িত এক ঠিকাদার বলেন, বিলের জন্য বাকি কাজ শেষ করতে পারছিলাম না।
পরে দুটি বিলের জন্য আধা শতাংশ হারে বাড়তি টাকা দিয়ে চেক নিতে হয়েছে। সড়ক নির্মানের কাজ করা আরেক ঠিকাদার জানান, " তিনটি বিল নিয়ে ঘুরছিলাম। পরে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি বিল ছাড়াতে হয়েছে। পরের দুটি বিলের জন্য আরো দুই লাখের মতো খরচ হয়েছে"।
তিনি বলেন, " খুশি হয়ে কিছু দিলে খারাপ লাগে না। কিন্তু গলায় পাড়া দিয়ে এভাবে টাকা আদায় আগে কখোনো হয়নি। নতুন প্রশাসকের কাছে আমাদের দাবি, তদন্ত কমিটি গঠন করে এই টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক"। কেসিসির বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে চেক নেওয়ার জন্য বাড়তি ঘুষের সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্যে দিতে রাজি হননি।
কেসিসির বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং ক্ষুদ্ধ বলে নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান,সবচেয়ে ছোট বিল হয় কেসিসির যান্ত্রিক বিভাগে। সাধারণত গাড়ির চাকা, নাট- বোল্ট কেনার জন্য আগাম খরচ করে পরে বিল তুলতে হয়। মাত্র ৩ লাখ টাকার সেই বিলেও আধা শতাংশ হারে ঘুষ দিতে হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জানাগেছে, নগরীর ৩১ টি ওয়ার্ডের সড়কে ঝাড়ু দিতে শলা কেনা হয়। গত বছর ৪ হাজার কেজি ঝাড়ুর শলা কেনা হয়েছে। এর প্রথম ধাপের ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা বিলের ফাইল তৈরি করা হয় গত ৫ জানুয়ারি। সামান্য এই টাকার বিলেও ঘুরছে দেড় মাস ধরে।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সহ সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, এধরনের কথা গত ৩০ বছরেও শুনিনি। অবিলম্বে এটি বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠন করে জড়িতদের খুঁজে বের করা দরকার। এব্যাপারে কেসিসির প্রশাসক মোঃ মোখতার আহমেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মঞ্জুরুল ফোন রিসিভ করেন এবং জানান সরকারি কাজে বিভাগীয় কমিশনার স্যার ঢাকায় আছেন। রবিবার অফিস করবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত