বিকেলের চায়ের সঙ্গে গরম গরম সিঙাড়া বাইরে মচমচে খোল, ভেতরে মশলাদার আলুর পুর। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, মরিচ কিংবা এক কাপ চা। বাঙালির আড্ডা ও অতিথি আপ্যায়নে এমন দৃশ্য যেন খুবই পরিচিত।
ঢাকার অলিগলি থেকে কলকাতার রাস্তা, বাড়ির নাশতা থেকে অফিসের টিফিন সিঙাড়া বাঙালির খাবার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিঙাড়া কি সত্যিই বাংলার নিজস্ব আবিষ্কার?
সিঙাড়ার ইতিহাস খুঁজতে গেলে সামনে আসে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় লোককথা। পাশাপাশি পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আসা পুরভরা পেস্ট্রির দীর্ঘ ইতিহাস।
অর্থাৎ সিঙাড়ার গল্প শুধু একটি খাবারের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্যপথ, রাজদরবার, মানুষের চলাচল, অভিবাসন ও স্থানীয় রান্নার বিবর্তন।
বাংলায় সিঙাড়ার জন্ম নিয়ে প্রচলিত গল্পগুলোর একটি নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে।
লোককথা অনুযায়ী, একদিন সকালে রাজাকে ঠান্ডা লুচি পরিবেশন করা হলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। হালুইকরকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজা।
তখন হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহরা স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে রাজদরবারে গিয়ে এমন একটি খাবার তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন, যা দীর্ঘক্ষণ গরম থাকবে।
এরপর তিনি ময়দার ছোট খোল তৈরি করে তার মধ্যে তরকারির পুর দিয়ে ত্রিভুজাকারে মুড়ে ঘিয়ে ভেজে নেন। তৈরি হয় নতুন একটি খাবার। খাবারটি গরম থাকায় রাজা খুশি হন এবং ধরিত্রী দেবীকে পুরস্কৃত করেন—এমনটাই বলা হয় লোককথায়।
এই গল্পের আরেক সংস্করণে বলা হয়, খাবারটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সমভুজা’। এর ত্রিভুজাকার আকৃতি থেকে নামটি এসেছে এবং পরে ‘সমভুজা’ বদলে ‘সিঙাড়া’ হয়েছে—এমন একটি মতও প্রচলিত আছে।
তবে গল্পটি আকর্ষণীয় হলেও এটিকে সিঙাড়ার নিশ্চিত ঐতিহাসিক জন্মকাহিনি বলা যায় না।
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে দেখা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে সিঙাড়ার পূর্বসূরি ধরনের খাবারের প্রচলন ছিল।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ত্রিভুজাকৃতির পুরভরা পেস্ট্রির প্রচলন ছিল। মধ্যযুগীয় আরবি রান্নার বইয়ে ‘সানবুসাক’, ‘সানবুসাজ’ বা কাছাকাছি নামের খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব নামের সঙ্গে ফারসি শব্দের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন খাদ্য-ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
বাণিজ্যপথ ও মানুষের চলাচলের সঙ্গে খাবারটিও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের পথ ধরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে।
তাই সিঙাড়া কোনো এক ব্যক্তি একদিন বসে আবিষ্কার করেছিলেন—এমন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
সিঙাড়া বা সমোসার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায় দিল্লি সালতানাতের সময়কার বিবরণে।
চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতার লেখায় দিল্লির রাজদরবারে পরিবেশিত একটি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে বর্তমান সমোসার পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়। এতে মাংস, বাদাম ও বিভিন্ন উপাদান দিয়ে পুর তৈরি করা হতো।
আমির খসরুর লেখাতেও রাজদরবারে সমোসার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে খাদ্য ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে।
তবে সেই সময়ের খাবার আজকের আলু ভরা সিঙাড়ার মতো ছিল না। মাংস, ঘি, পেঁয়াজ ও বাদামজাতীয় উপাদানই ছিল পুরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজকের বাঙালি সিঙাড়ার সবচেয়ে পরিচিত উপাদান আলু। অথচ আলু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি ফসল নয়।
আমেরিকা মহাদেশ থেকে আলু ইউরোপে যায় এবং পরে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে আলু আসার পর ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে।
স্থানীয় রান্নায় আলু জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিঙাড়ার পুরেও এর জায়গা তৈরি হয়। এভাবেই মাংসনির্ভর পুর থেকে ধীরে ধীরে সবজি ও আলুভিত্তিক সিঙাড়ার জনপ্রিয়তা বাড়ে।
ভারতীয় উপমহাদেশে এসে সিঙাড়া বা সমোসা বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রূপ পেতে শুরু করে।
কোথাও মাংসের পুর, কোথাও ডাল, বাদাম বা বিভিন্ন সবজি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলায় এসে আলু হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাদান।
শীতকালে ফুলকপি, মটরশুঁটি, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ ও নানা মশলার সংমিশ্রণে তৈরি সিঙাড়া বাঙালির কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। আবার কোথাও মাছ, মাংস কিংবা অন্য উপকরণ দিয়েও সিঙাড়া তৈরি হয়।
অর্থাৎ বাইরের কোনো খাবার বাংলায় এসে অপরিবর্তিত থাকেনি; স্থানীয় রুচি ও উপকরণের সঙ্গে বদলে তৈরি হয়েছে নিজস্ব রূপ।
সিঙাড়া নামটির উৎপত্তি নিয়েও একাধিক মত রয়েছে।
একটি মত অনুযায়ী, এর ত্রিভুজাকার আকৃতি জলফল ‘সিঙাড়া’ বা ‘সিংহারা’র মতো হওয়ায় নামটির সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ‘সমোসা’ বা ‘সমুচা’ নামটি ফারসি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
একই ধরনের পুরভরা ময়দার খাবার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নামও বদলেছে। বাংলায় এটি হয়েছে সিঙাড়া, আর ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলে পরিচিত হয়েছে সমোসা নামে।
বাংলার সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর পুর।
আলু, ফুলকপি, মটরশুঁটি, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ, আদা ও নানা মশলার সংমিশ্রণ একে আলাদা স্বাদ দিয়েছে। আকারেও রয়েছে বৈচিত্র্য কোথাও ছোট, কোথাও বড়; কোথাও পাতলা ও মচমচে খোল, আবার কোথাও তুলনামূলক মোটা।
এই বৈচিত্র্যই দেখায়, সিঙাড়া বাংলার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে কতটা গভীরভাবে মিশে গেছে।
দেশভাগের পর ঢাকা ও কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতিতে নানা পার্থক্য তৈরি হলেও সিঙাড়া দুই বাংলাতেই জনপ্রিয় নাশতা হিসেবে টিকে আছে।
বাংলাদেশে সিঙাড়া সাধারণত চায়ের দোকান, অফিসের টিফিন ও বিকেলের আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কোথাও আলুর পুর, কোথাও মাংস কিংবা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে এটি তৈরি হয়।
পশ্চিমবঙ্গেও সিঙাড়া বিশেষ করে শীতকাল, দুর্গাপূজা ও অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
এখানেই ইতিহাস ও লোককথার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও ধরিত্রী দেবীকে ঘিরে সিঙাড়ার জন্মের গল্পটি বাংলার একটি জনপ্রিয় লোককাহিনি। তবে ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে এটিকে সিঙাড়ার প্রকৃত আবিষ্কারের ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।
কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে সমোসার পূর্বসূরি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইবন বতুতার চতুর্দশ শতকের বিবরণ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তাই কৃষ্ণচন্দ্রের গল্পকে বাংলায় সিঙাড়ার স্থানীয় রূপ ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত একটি লোককথা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
সিঙাড়ার ইতিহাস দেখায়, একটি খাবার কীভাবে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার পুরভরা পেস্ট্রি থেকে ভারতীয় রাজদরবার, সেখান থেকে আঞ্চলিক রান্নাঘর আর শেষ পর্যন্ত বাংলার চায়ের দোকানে এসে সিঙাড়া পেয়েছে নতুন পরিচয়।
কোথাও মাংস, কোথাও বাদাম, কোথাও সবজি আর বাংলায় এসে আলু ও মশলার সঙ্গে তৈরি হয়েছে আমাদের চেনা সিঙাড়া।
গরম সিঙাড়ায় কামড় দেওয়ার সময় এর দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে আমরা হয়তো ভাবি না। চোখের সামনে থাকে শুধু মচমচে খোল আর মশলাদার পুর।
কিন্তু এই সাধারণ নাশতার পেছনে রয়েছে কয়েক শতকের সাংস্কৃতিক যাত্রা।
তাই সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এর জন্মস্থান নয়; বরং বহু সংস্কৃতির পথ পেরিয়ে বাংলায় এসে নিজের একটি স্বতন্ত্র ঘর তৈরি করে নেওয়াই এর আসল গল্প।

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
বিকেলের চায়ের সঙ্গে গরম গরম সিঙাড়া বাইরে মচমচে খোল, ভেতরে মশলাদার আলুর পুর। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, মরিচ কিংবা এক কাপ চা। বাঙালির আড্ডা ও অতিথি আপ্যায়নে এমন দৃশ্য যেন খুবই পরিচিত।
ঢাকার অলিগলি থেকে কলকাতার রাস্তা, বাড়ির নাশতা থেকে অফিসের টিফিন সিঙাড়া বাঙালির খাবার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিঙাড়া কি সত্যিই বাংলার নিজস্ব আবিষ্কার?
সিঙাড়ার ইতিহাস খুঁজতে গেলে সামনে আসে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় লোককথা। পাশাপাশি পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আসা পুরভরা পেস্ট্রির দীর্ঘ ইতিহাস।
অর্থাৎ সিঙাড়ার গল্প শুধু একটি খাবারের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্যপথ, রাজদরবার, মানুষের চলাচল, অভিবাসন ও স্থানীয় রান্নার বিবর্তন।
বাংলায় সিঙাড়ার জন্ম নিয়ে প্রচলিত গল্পগুলোর একটি নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে।
লোককথা অনুযায়ী, একদিন সকালে রাজাকে ঠান্ডা লুচি পরিবেশন করা হলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। হালুইকরকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজা।
তখন হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহরা স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে রাজদরবারে গিয়ে এমন একটি খাবার তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন, যা দীর্ঘক্ষণ গরম থাকবে।
এরপর তিনি ময়দার ছোট খোল তৈরি করে তার মধ্যে তরকারির পুর দিয়ে ত্রিভুজাকারে মুড়ে ঘিয়ে ভেজে নেন। তৈরি হয় নতুন একটি খাবার। খাবারটি গরম থাকায় রাজা খুশি হন এবং ধরিত্রী দেবীকে পুরস্কৃত করেন—এমনটাই বলা হয় লোককথায়।
এই গল্পের আরেক সংস্করণে বলা হয়, খাবারটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সমভুজা’। এর ত্রিভুজাকার আকৃতি থেকে নামটি এসেছে এবং পরে ‘সমভুজা’ বদলে ‘সিঙাড়া’ হয়েছে—এমন একটি মতও প্রচলিত আছে।
তবে গল্পটি আকর্ষণীয় হলেও এটিকে সিঙাড়ার নিশ্চিত ঐতিহাসিক জন্মকাহিনি বলা যায় না।
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে দেখা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে সিঙাড়ার পূর্বসূরি ধরনের খাবারের প্রচলন ছিল।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ত্রিভুজাকৃতির পুরভরা পেস্ট্রির প্রচলন ছিল। মধ্যযুগীয় আরবি রান্নার বইয়ে ‘সানবুসাক’, ‘সানবুসাজ’ বা কাছাকাছি নামের খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব নামের সঙ্গে ফারসি শব্দের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন খাদ্য-ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
বাণিজ্যপথ ও মানুষের চলাচলের সঙ্গে খাবারটিও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের পথ ধরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে।
তাই সিঙাড়া কোনো এক ব্যক্তি একদিন বসে আবিষ্কার করেছিলেন—এমন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
সিঙাড়া বা সমোসার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায় দিল্লি সালতানাতের সময়কার বিবরণে।
চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতার লেখায় দিল্লির রাজদরবারে পরিবেশিত একটি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে বর্তমান সমোসার পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়। এতে মাংস, বাদাম ও বিভিন্ন উপাদান দিয়ে পুর তৈরি করা হতো।
আমির খসরুর লেখাতেও রাজদরবারে সমোসার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে খাদ্য ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে।
তবে সেই সময়ের খাবার আজকের আলু ভরা সিঙাড়ার মতো ছিল না। মাংস, ঘি, পেঁয়াজ ও বাদামজাতীয় উপাদানই ছিল পুরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজকের বাঙালি সিঙাড়ার সবচেয়ে পরিচিত উপাদান আলু। অথচ আলু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি ফসল নয়।
আমেরিকা মহাদেশ থেকে আলু ইউরোপে যায় এবং পরে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে আলু আসার পর ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে।
স্থানীয় রান্নায় আলু জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিঙাড়ার পুরেও এর জায়গা তৈরি হয়। এভাবেই মাংসনির্ভর পুর থেকে ধীরে ধীরে সবজি ও আলুভিত্তিক সিঙাড়ার জনপ্রিয়তা বাড়ে।
ভারতীয় উপমহাদেশে এসে সিঙাড়া বা সমোসা বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রূপ পেতে শুরু করে।
কোথাও মাংসের পুর, কোথাও ডাল, বাদাম বা বিভিন্ন সবজি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলায় এসে আলু হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাদান।
শীতকালে ফুলকপি, মটরশুঁটি, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ ও নানা মশলার সংমিশ্রণে তৈরি সিঙাড়া বাঙালির কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। আবার কোথাও মাছ, মাংস কিংবা অন্য উপকরণ দিয়েও সিঙাড়া তৈরি হয়।
অর্থাৎ বাইরের কোনো খাবার বাংলায় এসে অপরিবর্তিত থাকেনি; স্থানীয় রুচি ও উপকরণের সঙ্গে বদলে তৈরি হয়েছে নিজস্ব রূপ।
সিঙাড়া নামটির উৎপত্তি নিয়েও একাধিক মত রয়েছে।
একটি মত অনুযায়ী, এর ত্রিভুজাকার আকৃতি জলফল ‘সিঙাড়া’ বা ‘সিংহারা’র মতো হওয়ায় নামটির সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ‘সমোসা’ বা ‘সমুচা’ নামটি ফারসি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
একই ধরনের পুরভরা ময়দার খাবার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নামও বদলেছে। বাংলায় এটি হয়েছে সিঙাড়া, আর ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলে পরিচিত হয়েছে সমোসা নামে।
বাংলার সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর পুর।
আলু, ফুলকপি, মটরশুঁটি, চিনাবাদাম, কাঁচা মরিচ, আদা ও নানা মশলার সংমিশ্রণ একে আলাদা স্বাদ দিয়েছে। আকারেও রয়েছে বৈচিত্র্য কোথাও ছোট, কোথাও বড়; কোথাও পাতলা ও মচমচে খোল, আবার কোথাও তুলনামূলক মোটা।
এই বৈচিত্র্যই দেখায়, সিঙাড়া বাংলার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে কতটা গভীরভাবে মিশে গেছে।
দেশভাগের পর ঢাকা ও কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতিতে নানা পার্থক্য তৈরি হলেও সিঙাড়া দুই বাংলাতেই জনপ্রিয় নাশতা হিসেবে টিকে আছে।
বাংলাদেশে সিঙাড়া সাধারণত চায়ের দোকান, অফিসের টিফিন ও বিকেলের আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কোথাও আলুর পুর, কোথাও মাংস কিংবা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে এটি তৈরি হয়।
পশ্চিমবঙ্গেও সিঙাড়া বিশেষ করে শীতকাল, দুর্গাপূজা ও অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
এখানেই ইতিহাস ও লোককথার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও ধরিত্রী দেবীকে ঘিরে সিঙাড়ার জন্মের গল্পটি বাংলার একটি জনপ্রিয় লোককাহিনি। তবে ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে এটিকে সিঙাড়ার প্রকৃত আবিষ্কারের ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।
কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ের বহু আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে সমোসার পূর্বসূরি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইবন বতুতার চতুর্দশ শতকের বিবরণ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তাই কৃষ্ণচন্দ্রের গল্পকে বাংলায় সিঙাড়ার স্থানীয় রূপ ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত একটি লোককথা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
সিঙাড়ার ইতিহাস দেখায়, একটি খাবার কীভাবে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার পুরভরা পেস্ট্রি থেকে ভারতীয় রাজদরবার, সেখান থেকে আঞ্চলিক রান্নাঘর আর শেষ পর্যন্ত বাংলার চায়ের দোকানে এসে সিঙাড়া পেয়েছে নতুন পরিচয়।
কোথাও মাংস, কোথাও বাদাম, কোথাও সবজি আর বাংলায় এসে আলু ও মশলার সঙ্গে তৈরি হয়েছে আমাদের চেনা সিঙাড়া।
গরম সিঙাড়ায় কামড় দেওয়ার সময় এর দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে আমরা হয়তো ভাবি না। চোখের সামনে থাকে শুধু মচমচে খোল আর মশলাদার পুর।
কিন্তু এই সাধারণ নাশতার পেছনে রয়েছে কয়েক শতকের সাংস্কৃতিক যাত্রা।
তাই সিঙাড়ার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এর জন্মস্থান নয়; বরং বহু সংস্কৃতির পথ পেরিয়ে বাংলায় এসে নিজের একটি স্বতন্ত্র ঘর তৈরি করে নেওয়াই এর আসল গল্প।
