মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

বিনোদন

ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা অধ্যায়

বিশ্বসুন্দরী থেকে বলিউডের মহাতারকা, ঐশ্বরিয়ার জীবনের যত অজানা গল্প!

বিশ্বসুন্দরী থেকে বলিউডের মহাতারকা, ঐশ্বরিয়ার জীবনের যত অজানা গল্প!
ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বসুন্দরী বলতেই একসময় কোটি মানুষের চোখে ভেসে উঠত যে মুখ, তিনি ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। নীল চোখ, মায়াবী হাসি আর অনন্য সৌন্দর্যে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী শুধু সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হিসেবে।

আজ ১ নভেম্বর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের ৫৩তম জন্মদিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ম্যাঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ধ্রুপদি নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল তার। ভরতনাট্যমেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মডেলিংয়ে যুক্ত হন।

১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান ঐশ্বরিয়া। এরপর মডেলিং থেকে চলচ্চিত্র, বলিউড থেকে হলিউড বিভিন্ন অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ভারত সরকারের পদ্মশ্রীও রয়েছে তার অর্জনের তালিকায়।

তবে ঐশ্বরিয়ার জীবন শুধু সৌন্দর্য ও সাফল্যের গল্প নয়। তার ক্যারিয়ারে রয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা, অজানা অভিজ্ঞতা এবং চমকপ্রদ অর্জন।

শাহরুখের বোনও হয়েছেন, প্রেমিকাও

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের সঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন ঐশ্বরিয়া। মজার বিষয় হলো, একই অভিনেতার সঙ্গে কখনো বোন, আবার কখনো প্রেমিকার চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়েছেন তিনি।

২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জোশ’ সিনেমায় শাহরুখের বোন শার্লি ডায়াস চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বরিয়া। একই বছর ‘মোহাব্বতে’ সিনেমায় শাহরুখের বিপরীতে মেঘা চরিত্রে দেখা যায় তাকে। এরপর ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’ সিনেমায় পার্বতী বা পারু চরিত্রে শাহরুখের প্রেমিকা হিসেবে অভিনয় করেন।

বিশেষ করে ‘দেবদাস’-এর পারু চরিত্রটি আজও ঐশ্বরিয়ার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

জেন অস্টিনের উপন্যাসেও নায়িকা

ইংরেজ সাহিত্যিক জেন অস্টিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে ঐশ্বরিয়ার।

২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া তামিল সিনেমা ‘কান্ডুকোন্ডাইন কান্ডুকোন্ডাইন’ নির্মিত হয়েছিল জেন অস্টিনের ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’ উপন্যাস অবলম্বনে। এতে মীনু চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সহশিল্পী ছিলেন টাবু।

এরপর ২০০৪ সালে ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ সিনেমায় ললিতা বক্সী চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বরিয়া। এটি জেন অস্টিনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’-এর আধুনিক ভারতীয় রূপান্তর।

নেদারল্যান্ডসে ফুলের নাম ঐশ্বরিয়া

একজন চলচ্চিত্র তারকার নামে ফুলের নামকরণ এমন ব্যতিক্রমী সম্মানও পেয়েছেন ঐশ্বরিয়া।

২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে তার সফরকে ঘিরে উজ্জ্বল রঙের একটি সংকর প্রজাতির টিউলিপ ফুলের নাম রাখা হয় ‘ঐশ্বরিয়া’। অভিনেত্রীর সৌন্দর্য ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার প্রতি সম্মান জানাতেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের লিসে শহরের বিখ্যাত কেউকেনহফ ফুলের বাগানেও এই টিউলিপ দেখা যায়।

অপরাহ উইনফ্রের অনুষ্ঠানে দুইবার

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঐশ্বরিয়ার জনপ্রিয়তার আরেকটি উদাহরণ মার্কিন উপস্থাপক অপরাহ উইনফ্রের বিখ্যাত টক শো ‘দ্য অপরাহ উইনফ্রে শো’তে তার উপস্থিতি।

২০০৫ সালে প্রথমবার এই অনুষ্ঠানে অতিথি হন তিনি। সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি, পারিবারিকভাবে বিয়ে, ভালোবাসার প্রকাশ এবং গায়ের রং নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। অপরাহকে গোলাপি রঙের শাড়িও উপহার দেন তিনি।

২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার এই অনুষ্ঠানে হাজির হন ঐশ্বরিয়া। সেবার তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী অভিষেক বচ্চন।

ব্র্যাড পিটের বিপরীতে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়েছিলেন

হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’-এ ব্র্যাড পিটের বিপরীতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া। সিনেমাটিতে জেন স্মিথ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি তিনি।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেমাটির ঘনিষ্ঠ ও চুম্বন দৃশ্যের কারণে চরিত্রটি করতে আগ্রহী ছিলেন না অভিনেত্রী।

এ ছাড়া কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের সঙ্গে ‘কেওস’ নামের একটি সিনেমায় কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তবে দুই অভিনেত্রীর সম্মতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি নির্মিত হয়নি।

পর্দায় পারু থেকে বিনোদিনী, অভিনয়ে নানা রূপ

ঐশ্বরিয়ার অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরিত্রের বৈচিত্র্য। ১৯৯৭ সালে মণি রত্নম পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘ইরুভার’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। একই বছর ‘অউর পেয়ার হো গয়া’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন।

১৯৯৯ সালে ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ সিনেমায় নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। একই বছর ‘তাল’ সিনেমায় মানসী চরিত্রেও দর্শকের নজর কাড়েন।

এরপর ‘জোশ’, ‘মোহাব্বতে’ ও ‘দেবদাস’-এর মতো সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।

২০০৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত বাংলা সিনেমা ‘চোখের বালি’তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনোদিনী হয়ে পর্দায় হাজির হন ঐশ্বরিয়া। একজন শিক্ষিত তরুণ বিধবার আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্পে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।

২০০৬ সালে ‘উমরাও জান’ সিনেমায় আমিরান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়া ‘ধুম ২’, ‘গুরু’, ‘যোধা আকবর’, ‘গুজারিশ’, ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’, ‘সর্বজিৎ’ এবং ‘পন্নিয়িন সেলভান’ সিরিজেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে।

হলিউডেও রেখেছেন নিজের ছাপ

বলিউডের বাইরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন ঐশ্বরিয়া। তার অভিনীত ইংরেজি ভাষার সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘দ্য মিস্ট্রেস অব স্পাইসেস’, ‘প্রভোকড’, ‘দ্য লাস্ট লিজিয়ন’ ও ‘দ্য পিংক প্যান্থার ২’।

২০০২ সালে ‘দেবদাস’ সিনেমার প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রথমবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেন তিনি। ২০০৩ সালে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় তার উপস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ফ্যাশন ও পোশাকের ক্ষেত্রেও তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিচিতি।

একসময় ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে ১৭ হাজার ওয়েবসাইট!

ইন্টারনেটের শুরুর দিকের জনপ্রিয়তার সময়েও ঐশ্বরিয়ার অবস্থান ছিল ব্যতিক্রমী। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে বিশ্বজুড়ে তাকে নিয়ে প্রায় ১৭ হাজার ভক্তদের তৈরি ওয়েবসাইট ছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুরাগীরা এসব ওয়েবসাইটে তার অভিনয়, ব্যক্তিজীবন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর তুলে ধরতেন। এত বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটের মধ্যে মাত্র একটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন অভিনেত্রী বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মডেলিংয়ের শুরুতেও ছিল নানা অভিজ্ঞতা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পেনসিলের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তাকে। পরবর্তী সময়ে মাহিমা চৌধুরীর সঙ্গে পেপসির বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।

পদ্মশ্রীসহ অসংখ্য পুরস্কার, বিপুল সম্পদের মালিক

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ঐশ্বরিয়া। ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ও ‘দেবদাস’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন।

২০০৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১২ সালে ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকেও ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ সম্মাননা পান।

অভিনয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দূত হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড চুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সম্পদবিষয়ক ওয়েবসাইটের অনুমান অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এই পরিমাণের কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।

অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে সংসার, মেয়ে আরাধ্যা

ব্যক্তিজীবন নিয়েও বরাবরই আলোচনায় ছিলেন ঐশ্বরিয়া। একসময় সালমান খান ও বিবেক ওবেরয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে নানা আলোচনা ছিল।

পরে ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল অভিনেতা অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করেন তিনি। ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর তাদের ঘরে জন্ম নেয় মেয়ে আরাধ্যা বচ্চন।

অভিনয়জীবনের পাশাপাশি পরিবার ও মেয়েকে সময় দিতেও দেখা যায় এই অভিনেত্রীকে।

২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পন্নিয়িন সেলভান’ এবং ২০২৩ সালে এর দ্বিতীয় পর্বে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে আবারও আলোচনায় আসেন ঐশ্বরিয়া।

বিশ্বসুন্দরীর মুকুট থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচা ঐশ্বরিয়ার পথচলা তিন দশকেরও বেশি সময়ের। সময়ের সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্রের ধারা, বদলেছে দর্শকের রুচি; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা এখনো স্বতন্ত্র। সৌন্দর্যের পাশাপাশি অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করাই তাকে বলিউডের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত করেছে।

সূত্র: দ্য ফ্রি প্রেস জার্নাল, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশিত সাক্ষাৎকার।

#বলিউড_তারকা #ঐশ্বরিয়া_রাই_বচ্চন #ঐশ্বরিয়ার_জন্মদিন

চেকপোস্ট

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


বিশ্বসুন্দরী থেকে বলিউডের মহাতারকা, ঐশ্বরিয়ার জীবনের যত অজানা গল্প!

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

বিশ্বসুন্দরী বলতেই একসময় কোটি মানুষের চোখে ভেসে উঠত যে মুখ, তিনি ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। নীল চোখ, মায়াবী হাসি আর অনন্য সৌন্দর্যে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী শুধু সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হিসেবে।


আজ ১ নভেম্বর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের ৫৩তম জন্মদিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ম্যাঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ধ্রুপদি নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল তার। ভরতনাট্যমেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মডেলিংয়ে যুক্ত হন।


১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান ঐশ্বরিয়া। এরপর মডেলিং থেকে চলচ্চিত্র, বলিউড থেকে হলিউড বিভিন্ন অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ভারত সরকারের পদ্মশ্রীও রয়েছে তার অর্জনের তালিকায়।


তবে ঐশ্বরিয়ার জীবন শুধু সৌন্দর্য ও সাফল্যের গল্প নয়। তার ক্যারিয়ারে রয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা, অজানা অভিজ্ঞতা এবং চমকপ্রদ অর্জন।

শাহরুখের বোনও হয়েছেন, প্রেমিকাও

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের সঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন ঐশ্বরিয়া। মজার বিষয় হলো, একই অভিনেতার সঙ্গে কখনো বোন, আবার কখনো প্রেমিকার চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়েছেন তিনি।


২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জোশ’ সিনেমায় শাহরুখের বোন শার্লি ডায়াস চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বরিয়া। একই বছর ‘মোহাব্বতে’ সিনেমায় শাহরুখের বিপরীতে মেঘা চরিত্রে দেখা যায় তাকে। এরপর ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’ সিনেমায় পার্বতী বা পারু চরিত্রে শাহরুখের প্রেমিকা হিসেবে অভিনয় করেন।


বিশেষ করে ‘দেবদাস’-এর পারু চরিত্রটি আজও ঐশ্বরিয়ার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

জেন অস্টিনের উপন্যাসেও নায়িকা

ইংরেজ সাহিত্যিক জেন অস্টিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে ঐশ্বরিয়ার।


২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া তামিল সিনেমা ‘কান্ডুকোন্ডাইন কান্ডুকোন্ডাইন’ নির্মিত হয়েছিল জেন অস্টিনের ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’ উপন্যাস অবলম্বনে। এতে মীনু চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সহশিল্পী ছিলেন টাবু।


এরপর ২০০৪ সালে ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ সিনেমায় ললিতা বক্সী চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বরিয়া। এটি জেন অস্টিনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’-এর আধুনিক ভারতীয় রূপান্তর।

নেদারল্যান্ডসে ফুলের নাম ঐশ্বরিয়া

একজন চলচ্চিত্র তারকার নামে ফুলের নামকরণ এমন ব্যতিক্রমী সম্মানও পেয়েছেন ঐশ্বরিয়া।


২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে তার সফরকে ঘিরে উজ্জ্বল রঙের একটি সংকর প্রজাতির টিউলিপ ফুলের নাম রাখা হয় ‘ঐশ্বরিয়া’। অভিনেত্রীর সৌন্দর্য ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার প্রতি সম্মান জানাতেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।


নেদারল্যান্ডসের লিসে শহরের বিখ্যাত কেউকেনহফ ফুলের বাগানেও এই টিউলিপ দেখা যায়।

অপরাহ উইনফ্রের অনুষ্ঠানে দুইবার

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঐশ্বরিয়ার জনপ্রিয়তার আরেকটি উদাহরণ মার্কিন উপস্থাপক অপরাহ উইনফ্রের বিখ্যাত টক শো ‘দ্য অপরাহ উইনফ্রে শো’তে তার উপস্থিতি।


২০০৫ সালে প্রথমবার এই অনুষ্ঠানে অতিথি হন তিনি। সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি, পারিবারিকভাবে বিয়ে, ভালোবাসার প্রকাশ এবং গায়ের রং নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। অপরাহকে গোলাপি রঙের শাড়িও উপহার দেন তিনি।


২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার এই অনুষ্ঠানে হাজির হন ঐশ্বরিয়া। সেবার তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী অভিষেক বচ্চন।

ব্র্যাড পিটের বিপরীতে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়েছিলেন

হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’-এ ব্র্যাড পিটের বিপরীতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া। সিনেমাটিতে জেন স্মিথ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি তিনি।


বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেমাটির ঘনিষ্ঠ ও চুম্বন দৃশ্যের কারণে চরিত্রটি করতে আগ্রহী ছিলেন না অভিনেত্রী।


এ ছাড়া কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের সঙ্গে ‘কেওস’ নামের একটি সিনেমায় কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তবে দুই অভিনেত্রীর সম্মতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি নির্মিত হয়নি।

পর্দায় পারু থেকে বিনোদিনী, অভিনয়ে নানা রূপ

ঐশ্বরিয়ার অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরিত্রের বৈচিত্র্য। ১৯৯৭ সালে মণি রত্নম পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘ইরুভার’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। একই বছর ‘অউর পেয়ার হো গয়া’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু করেন।


১৯৯৯ সালে ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ সিনেমায় নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। একই বছর ‘তাল’ সিনেমায় মানসী চরিত্রেও দর্শকের নজর কাড়েন।


এরপর ‘জোশ’, ‘মোহাব্বতে’ ও ‘দেবদাস’-এর মতো সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।


২০০৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত বাংলা সিনেমা ‘চোখের বালি’তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনোদিনী হয়ে পর্দায় হাজির হন ঐশ্বরিয়া। একজন শিক্ষিত তরুণ বিধবার আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্পে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।


২০০৬ সালে ‘উমরাও জান’ সিনেমায় আমিরান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়া ‘ধুম ২’, ‘গুরু’, ‘যোধা আকবর’, ‘গুজারিশ’, ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’, ‘সর্বজিৎ’ এবং ‘পন্নিয়িন সেলভান’ সিরিজেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে।

হলিউডেও রেখেছেন নিজের ছাপ

বলিউডের বাইরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন ঐশ্বরিয়া। তার অভিনীত ইংরেজি ভাষার সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘দ্য মিস্ট্রেস অব স্পাইসেস’, ‘প্রভোকড’, ‘দ্য লাস্ট লিজিয়ন’ ও ‘দ্য পিংক প্যান্থার ২’।


২০০২ সালে ‘দেবদাস’ সিনেমার প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রথমবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেন তিনি। ২০০৩ সালে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।


এরপর থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় তার উপস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ফ্যাশন ও পোশাকের ক্ষেত্রেও তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিচিতি।

একসময় ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে ১৭ হাজার ওয়েবসাইট!

ইন্টারনেটের শুরুর দিকের জনপ্রিয়তার সময়েও ঐশ্বরিয়ার অবস্থান ছিল ব্যতিক্রমী। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে বিশ্বজুড়ে তাকে নিয়ে প্রায় ১৭ হাজার ভক্তদের তৈরি ওয়েবসাইট ছিল।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুরাগীরা এসব ওয়েবসাইটে তার অভিনয়, ব্যক্তিজীবন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর তুলে ধরতেন। এত বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটের মধ্যে মাত্র একটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন অভিনেত্রী বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


মডেলিংয়ের শুরুতেও ছিল নানা অভিজ্ঞতা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পেনসিলের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তাকে। পরবর্তী সময়ে মাহিমা চৌধুরীর সঙ্গে পেপসির বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।

পদ্মশ্রীসহ অসংখ্য পুরস্কার, বিপুল সম্পদের মালিক

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ঐশ্বরিয়া। ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ও ‘দেবদাস’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন।


২০০৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১২ সালে ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকেও ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ সম্মাননা পান।


অভিনয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দূত হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড চুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সম্পদবিষয়ক ওয়েবসাইটের অনুমান অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এই পরিমাণের কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।

অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে সংসার, মেয়ে আরাধ্যা

ব্যক্তিজীবন নিয়েও বরাবরই আলোচনায় ছিলেন ঐশ্বরিয়া। একসময় সালমান খান ও বিবেক ওবেরয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে নানা আলোচনা ছিল।


পরে ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল অভিনেতা অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করেন তিনি। ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর তাদের ঘরে জন্ম নেয় মেয়ে আরাধ্যা বচ্চন।


অভিনয়জীবনের পাশাপাশি পরিবার ও মেয়েকে সময় দিতেও দেখা যায় এই অভিনেত্রীকে।


২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পন্নিয়িন সেলভান’ এবং ২০২৩ সালে এর দ্বিতীয় পর্বে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে আবারও আলোচনায় আসেন ঐশ্বরিয়া।


বিশ্বসুন্দরীর মুকুট থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচা ঐশ্বরিয়ার পথচলা তিন দশকেরও বেশি সময়ের। সময়ের সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্রের ধারা, বদলেছে দর্শকের রুচি; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা এখনো স্বতন্ত্র। সৌন্দর্যের পাশাপাশি অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করাই তাকে বলিউডের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত করেছে।


সূত্র: দ্য ফ্রি প্রেস জার্নাল, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশিত সাক্ষাৎকার।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত