মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

সারাদেশ

দ্রুত সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের

চারশত বছরের জোড় মন্দির সংস্কারের অভাবে বিলীনের পথে

চারশত বছরের জোড় মন্দির সংস্কারের অভাবে বিলীনের পথে
ছবি : চেকপোস্ট

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুড়াদহ গ্রামের ঐতিহাসিক জোড় মন্দির এখন অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘদিনের অযত্ন, বৃষ্টির পানি, রোদ ও গাছপালার আগ্রাসনে মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে। আগাছা, বাঁশঝাড় ও জঙ্গলে প্রায় ঢেকে গেছে পুরো স্থাপনাটি।

স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরটির বয়স প্রায় ৪০০ বছর। তবে প্রকৃত নির্মাণকাল ও ইতিহাস নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ গঙ্গাচড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য-এ মন্দিরটি অষ্টাদশ শতক কিংবা তারও আগে নির্মিত বলে উল্লেখ রয়েছে।

বড়বিল ইউনিয়নের ঠাকুড়াদহ গ্রামে অবস্থিত মন্দিরটির স্থাপত্যে একসময় দুটি দোতলা চূড়া ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে এর সঙ্গে আরও চারটি ছোট চূড়া যুক্ত হয়। প্রবেশপথের দুই পাশে ছিল সিংহের মূর্তি। সময়ের সঙ্গে এসবের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কোনোভাবে একটি চূড়া টিকে আছে। পুরোনো দেয়ালে এখনো পোড়ামাটির কারুকাজের কিছু নিদর্শন দেখা যায়।

স্থাপত্যের ধরন ও ব্যবহৃত ইট দেখে স্থানীয়ভাবে এটিকে অষ্টাদশ শতক বা তারও আগের নবরত্ন মন্দির বলে ধারণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, মন্দিরের পাশে ‘শেখ কুয়া’ নামে একটি কুয়া ছিল এবং সেখানে কষ্টিপাথরের কয়েকটি মূর্তি থাকার কথাও প্রচলিত রয়েছে। দক্ষিণ পাশে একই সময়ে নির্মিত তিনতলা একটি মঠ ছিল বলেও তারা জানান। পাকিস্তান আমলে মঠটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

একসময় মন্দিরকে ঘিরে নিয়মিত পূজা, রাসলীলা ও মেলার আয়োজন হতো। দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগমে উৎসবমুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৯৮০ সালের দিকে মন্দিরটির নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পূজা ও রক্ষণাবেক্ষণও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তবে পরবর্তী সময়েও অন্তত দুবার রাসমেলাসহ পূজার আয়োজন হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মন্দিরটিকে ঘিরে একাধিক লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। এক রাতেই মন্দির ও পাশের পুকুর তৈরি হয়েছিল—এমন বিশ্বাস রয়েছে স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে। আবার মাটির নিচে মূল্যবান নিদর্শন বা সম্পদ থাকার কথাও লোকমুখে শোনা যায়। এসবের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের ভেতর ও চারপাশে গাছপালা ও আগাছা জন্মেছে। পুরোনো দেয়ালে গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টি ও রোদের ক্ষয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইটের গাঁথুনি। ফলে অবশিষ্ট স্থাপনাটিও আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় নবীন কুমার বলেন, মন্দিরটি কত বছরের পুরোনো এবং কে এটি নির্মাণ করেছিলেন, তা গবেষণার মাধ্যমে বের করা দরকার। শুধু লোকমুখে প্রচলিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

পূজা উদযাপন পরিষদ গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার সহসভাপতি শ্যামল চন্দ্র ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। বড়বিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সামছুল হুদাও মন্দিরটির প্রকৃত ইতিহাস ও বয়স অনুসন্ধানের পাশাপাশি দ্রুত সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর ফিল্ড অফিসার আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল জানান, মন্দিরটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, স্থাপনাটি সংরক্ষণের উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

#রংপুর #গঙ্গাচড়া #জোড়মন্দির

চেকপোস্ট

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


চারশত বছরের জোড় মন্দির সংস্কারের অভাবে বিলীনের পথে

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুড়াদহ গ্রামের ঐতিহাসিক জোড় মন্দির এখন অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘদিনের অযত্ন, বৃষ্টির পানি, রোদ ও গাছপালার আগ্রাসনে মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে। আগাছা, বাঁশঝাড় ও জঙ্গলে প্রায় ঢেকে গেছে পুরো স্থাপনাটি।

স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরটির বয়স প্রায় ৪০০ বছর। তবে প্রকৃত নির্মাণকাল ও ইতিহাস নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ গঙ্গাচড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য-এ মন্দিরটি অষ্টাদশ শতক কিংবা তারও আগে নির্মিত বলে উল্লেখ রয়েছে।

বড়বিল ইউনিয়নের ঠাকুড়াদহ গ্রামে অবস্থিত মন্দিরটির স্থাপত্যে একসময় দুটি দোতলা চূড়া ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে এর সঙ্গে আরও চারটি ছোট চূড়া যুক্ত হয়। প্রবেশপথের দুই পাশে ছিল সিংহের মূর্তি। সময়ের সঙ্গে এসবের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কোনোভাবে একটি চূড়া টিকে আছে। পুরোনো দেয়ালে এখনো পোড়ামাটির কারুকাজের কিছু নিদর্শন দেখা যায়।

স্থাপত্যের ধরন ও ব্যবহৃত ইট দেখে স্থানীয়ভাবে এটিকে অষ্টাদশ শতক বা তারও আগের নবরত্ন মন্দির বলে ধারণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, মন্দিরের পাশে ‘শেখ কুয়া’ নামে একটি কুয়া ছিল এবং সেখানে কষ্টিপাথরের কয়েকটি মূর্তি থাকার কথাও প্রচলিত রয়েছে। দক্ষিণ পাশে একই সময়ে নির্মিত তিনতলা একটি মঠ ছিল বলেও তারা জানান। পাকিস্তান আমলে মঠটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

একসময় মন্দিরকে ঘিরে নিয়মিত পূজা, রাসলীলা ও মেলার আয়োজন হতো। দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগমে উৎসবমুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৯৮০ সালের দিকে মন্দিরটির নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পূজা ও রক্ষণাবেক্ষণও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তবে পরবর্তী সময়েও অন্তত দুবার রাসমেলাসহ পূজার আয়োজন হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মন্দিরটিকে ঘিরে একাধিক লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। এক রাতেই মন্দির ও পাশের পুকুর তৈরি হয়েছিল—এমন বিশ্বাস রয়েছে স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে। আবার মাটির নিচে মূল্যবান নিদর্শন বা সম্পদ থাকার কথাও লোকমুখে শোনা যায়। এসবের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের ভেতর ও চারপাশে গাছপালা ও আগাছা জন্মেছে। পুরোনো দেয়ালে গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টি ও রোদের ক্ষয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইটের গাঁথুনি। ফলে অবশিষ্ট স্থাপনাটিও আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় নবীন কুমার বলেন, মন্দিরটি কত বছরের পুরোনো এবং কে এটি নির্মাণ করেছিলেন, তা গবেষণার মাধ্যমে বের করা দরকার। শুধু লোকমুখে প্রচলিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

পূজা উদযাপন পরিষদ গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার সহসভাপতি শ্যামল চন্দ্র ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। বড়বিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সামছুল হুদাও মন্দিরটির প্রকৃত ইতিহাস ও বয়স অনুসন্ধানের পাশাপাশি দ্রুত সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর ফিল্ড অফিসার আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল জানান, মন্দিরটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, স্থাপনাটি সংরক্ষণের উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত