নদীমাতৃক জেলা কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এ জেলায় অন্তত ১৬টি নদ নদী প্রবাহিত হলেও বাস্তবে ছোট বড় মিলিয়ে নদীর সংখ্যা আরও বেশি। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, ফুলকুমার ও গঙ্গাধরের মতো নদীগুলো শুধু কৃষিকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং মৎস্যসম্পদ, চরভিত্তিক অর্থনীতি এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থার এক অনন্য সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। উর্বর পলল ভূমি এবং বিশাল নদী অববাহিকার কারণে কুড়িগ্রাম ভবিষ্যতে কৃষি ও মৎস্য গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হওয়ার সক্ষমতা রাখে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় হবে, এ নিয়ে শুরু থেকেই মতভেদ রয়েছে। এটি স্বাভাবিক। কারণ একটি বড় প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষার কেন্দ্র নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিও তৈরি করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা আঞ্চলিক আবেগের চেয়ে বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
গতকাল ১০ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী জনাব আসাদুল হাবিব দুলু মহোদয়ের কুড়িগ্রাম সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস এলাকা পরিদর্শন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ দীর্ঘদিনের আলোচনাকে বাস্তব সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সম্ভাবনা এতে তৈরি হয়েছে। আশা করি, এ ধরনের পরিদর্শন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তে রূপ নেবে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দাসেরহাট এবং ধরলা ব্রিজের উত্তর পাশের এলাকা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, ধরলা ব্রিজের উত্তর পাশে পাঁচগাছি, যাত্রাপুর কিংবা সুবিধাজনক সংলগ্ন এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন সবচেয়ে কার্যকর ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পতিত ও নিম্নাঞ্চলীয় জমি রয়েছে, যা পরিকল্পিত ড্রেজিং ও ভরাটের মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব। ইতোমধ্যে ধরলার উত্তর পাশে বিভিন্ন এলাকায় ভরাট কার্যক্রমও চোখে পড়ছে। ফলে সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি গবেষণা। নদী, চরাঞ্চল, কৃষিজমি এবং মৎস্যসম্পদের কাছাকাছি অবস্থান হলে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ পাবেন। ধরলা নদীসংলগ্ন এলাকা ভবিষ্যতে নদীকেন্দ্রিক কৃষি, বন্যা সহনশীল ফসল, জলবায়ু অভিযোজন এবং মৎস্য গবেষণার অন্যতম মডেল হতে পারে।
তৃতীয়ত, কুড়িগ্রামের উন্নয়ন করতে হলে চরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি যদি এই অঞ্চলে হয়, তাহলে চরবাসীর অর্থনীতি, কৃষি প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
চতুর্থত, যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও এই এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ধরলা সেতুর কারণে লালমনিরহাটসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সহজ সংযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর সেতু নির্মিত হলে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস শুধু কয়েকটি ভবনের নাম নয়। এটি আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের উন্নয়নের ভিত্তি। তাই সিদ্ধান্তও হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, গবেষণাসমৃদ্ধ এবং কুড়িগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নকে সামনে রেখে।
আমরা চাই, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান না হয়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, গবেষণা, মৎস্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হোক।
প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান
সাবেক অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
নদীমাতৃক জেলা কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এ জেলায় অন্তত ১৬টি নদ নদী প্রবাহিত হলেও বাস্তবে ছোট বড় মিলিয়ে নদীর সংখ্যা আরও বেশি। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, ফুলকুমার ও গঙ্গাধরের মতো নদীগুলো শুধু কৃষিকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং মৎস্যসম্পদ, চরভিত্তিক অর্থনীতি এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থার এক অনন্য সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। উর্বর পলল ভূমি এবং বিশাল নদী অববাহিকার কারণে কুড়িগ্রাম ভবিষ্যতে কৃষি ও মৎস্য গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হওয়ার সক্ষমতা রাখে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় হবে, এ নিয়ে শুরু থেকেই মতভেদ রয়েছে। এটি স্বাভাবিক। কারণ একটি বড় প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষার কেন্দ্র নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিও তৈরি করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা আঞ্চলিক আবেগের চেয়ে বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
গতকাল ১০ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী জনাব আসাদুল হাবিব দুলু মহোদয়ের কুড়িগ্রাম সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস এলাকা পরিদর্শন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ দীর্ঘদিনের আলোচনাকে বাস্তব সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সম্ভাবনা এতে তৈরি হয়েছে। আশা করি, এ ধরনের পরিদর্শন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তে রূপ নেবে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দাসেরহাট এবং ধরলা ব্রিজের উত্তর পাশের এলাকা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, ধরলা ব্রিজের উত্তর পাশে পাঁচগাছি, যাত্রাপুর কিংবা সুবিধাজনক সংলগ্ন এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন সবচেয়ে কার্যকর ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পতিত ও নিম্নাঞ্চলীয় জমি রয়েছে, যা পরিকল্পিত ড্রেজিং ও ভরাটের মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব। ইতোমধ্যে ধরলার উত্তর পাশে বিভিন্ন এলাকায় ভরাট কার্যক্রমও চোখে পড়ছে। ফলে সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি গবেষণা। নদী, চরাঞ্চল, কৃষিজমি এবং মৎস্যসম্পদের কাছাকাছি অবস্থান হলে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ পাবেন। ধরলা নদীসংলগ্ন এলাকা ভবিষ্যতে নদীকেন্দ্রিক কৃষি, বন্যা সহনশীল ফসল, জলবায়ু অভিযোজন এবং মৎস্য গবেষণার অন্যতম মডেল হতে পারে।
তৃতীয়ত, কুড়িগ্রামের উন্নয়ন করতে হলে চরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি যদি এই অঞ্চলে হয়, তাহলে চরবাসীর অর্থনীতি, কৃষি প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
চতুর্থত, যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও এই এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ধরলা সেতুর কারণে লালমনিরহাটসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সহজ সংযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর সেতু নির্মিত হলে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস শুধু কয়েকটি ভবনের নাম নয়। এটি আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের উন্নয়নের ভিত্তি। তাই সিদ্ধান্তও হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, গবেষণাসমৃদ্ধ এবং কুড়িগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নকে সামনে রেখে।
আমরা চাই, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান না হয়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, গবেষণা, মৎস্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হোক।
প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান
সাবেক অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ
