সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

জাতীয়

দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনায় ভুগছে সাধারণ মানুষ

স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ, তবু রোগীর পকেট ফাঁকা! চিকিৎসায় ৮০% খরচ নিজেকেই

স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ, তবু রোগীর পকেট ফাঁকা! চিকিৎসায় ৮০% খরচ নিজেকেই
সরকারি হাসপাতালে রোগীর ভিড়। ছবি : গণমাধ্যম থেকে নেওয়া

দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ গত পাঁচ বছরে কাগজে-কলমে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায়। কিন্তু বরাদ্দ বাড়লেও কমেনি রোগীর চিকিৎসা ব্যয়। বরং রোগীর নিজস্ব বা আউট-অব-পকেট খরচ বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে প্রতিবছর ৬১ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব, সরকারি হাসপাতালে সেবার দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যয়, দুর্নীতি ও কেনাকাটানির্ভর উন্নয়ন নীতির কারণে স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ মানুষের প্রত্যাশিত সেবায় পৌঁছাচ্ছে না।

বাজেট দ্বিগুণ হলেও জিডিপিতে মাত্র ১.০১%

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

তবে এই বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.০১ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তুলনা করলে প্রকৃত অর্থে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বৃদ্ধি খুব বেশি নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

রোগীর পকেট খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে রোগীর নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে এ ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি হয়েছে উল্টো। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে রোগীর নিজস্ব ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭৯ থেকে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও চিকিৎসার বড় অংশের ব্যয় এখনো বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।

পেসমেকার কিনতেই ৯ লাখ, নিঃস্ব পরিবার

রাজশাহী মেডিকেল থেকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে মায়ের চিকিৎসার জন্য আসেন ৭৯ বছর বয়সী পিয়ারা বেগমের ছেলে ডালিম। তার মায়ের চিকিৎসায় মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

ডালিম জানান, শুধু আইসিডি ডিভাইস বা পেসমেকার কিনতেই খরচ হয়েছে ৯ লাখ টাকা। মায়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে জমিজমা ও পরিবারের একমাত্র গরুটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাদের।

এখন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব।

সরকারি সেবার দুর্বলতায় বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছে মানুষ

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সের সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও সেবার নানা দুর্বলতার কারণে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন।

বাড্ডার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার দিন ভর্তি থেকে সাধারণ হামের চিকিৎসা নিতে ২৯ বছর বয়সী নাজমুন নাহার তামান্নার খরচ হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালের সেবা কার্যকর না হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষও দ্রুত চিকিৎসার আশায় বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।

ওষুধের ৯৩ শতাংশই কিনতে হচ্ছে নিজের টাকায়

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সংকট হলো ওষুধের ব্যয়। ১৯৯৮ সালের সেক্টর প্রোগ্রামে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কখনো ৩০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়িত হয়নি।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ওষুধ সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কিনতে হয়।

অর্থাৎ ওষুধের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশই বহন করছেন রোগীরা

দরিদ্র পরিবারের আয়ের ৩৫% চলে যায় চিকিৎসায়

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা ব্যয় করতে হয়। যা পরিবারের মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

তবে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই চিকিৎসার পেছনে চলে যায়

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর ৬১ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন।

বাজেট নয়, ব্যবস্থাপনার সংকটও বড় কারণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রুমানা হকের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগও দ্রুত বাড়ছে।

আধুনিক চিকিৎসা, নতুন ওষুধ ও প্রযুক্তির কারণে চিকিৎসার ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও তা জনসংখ্যা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, বরাদ্দের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হওয়ায় প্রকৃত সেবা খাতে পৌঁছায় তুলনামূলকভাবে কম অর্থ।

দেশে মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেন। বাকি ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যবিমার অভাব এবং সরকারি হাসপাতালে অসংক্রামক রোগের সমন্বিত সেবার ঘাটতি মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য করছে।

দুর্নীতি বন্ধ না হলে বাজেট বাড়িয়েও লাভ নেই

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খানের মতে, শুধু বাজেট বা হাসপাতালের ভবন বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের সংকট দূর করা সম্ভব নয়।

তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও কেনাকাটানির্ভর নীতি বন্ধ করতে হবে। এসব সংস্কার ছাড়া স্বাস্থ্য বাজেট ৩ থেকে ৫ গুণ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না

তার মতে, স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় চলে যায়। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর ফল হিসেবে গজ, ব্যান্ডেজ থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত রোগীকেই কিনতে হচ্ছে। এতে আরও বাড়ছে রোগীর আউট-অব-পকেট এক্সপেন্ডিচার

উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চান বিশেষজ্ঞরা

অধ্যাপক সবুর খান মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। তার প্রস্তাব—উপজেলার সব বিশেষজ্ঞ পদ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চিকিৎসককে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া উচিত নয়।

এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ দুই শিফটে চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেবা চালু করা হলে রোগীরা বেশি সময় চিকিৎসাসেবা পাবেন এবং চিকিৎসকদের বৈকালিক প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রবণতাও কমতে পারে।

শেষ কথা

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অঙ্ক বড় হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমেনি। বরং ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও হাসপাতাল ব্যয়ের বড় অংশ এখনো রোগীর নিজের পকেট থেকেই যাচ্ছে।

তাই প্রশ্ন শুধু স্বাস্থ্য বাজেট কত তা নয়; বরং বরাদ্দের কতটা সরাসরি রোগীর চিকিৎসাসেবায় পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

#স্বাস্থ্যবাজেট #চিকিৎসাব্যয় #বাংলাদেশেরস্বাস্থ্যখাত

চেকপোস্ট

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ, তবু রোগীর পকেট ফাঁকা! চিকিৎসায় ৮০% খরচ নিজেকেই

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ গত পাঁচ বছরে কাগজে-কলমে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায়। কিন্তু বরাদ্দ বাড়লেও কমেনি রোগীর চিকিৎসা ব্যয়। বরং রোগীর নিজস্ব বা আউট-অব-পকেট খরচ বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে প্রতিবছর ৬১ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব, সরকারি হাসপাতালে সেবার দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যয়, দুর্নীতি ও কেনাকাটানির্ভর উন্নয়ন নীতির কারণে স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ মানুষের প্রত্যাশিত সেবায় পৌঁছাচ্ছে না।

বাজেট দ্বিগুণ হলেও জিডিপিতে মাত্র ১.০১%

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

তবে এই বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.০১ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তুলনা করলে প্রকৃত অর্থে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বৃদ্ধি খুব বেশি নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

রোগীর পকেট খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে রোগীর নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে এ ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি হয়েছে উল্টো। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে রোগীর নিজস্ব ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭৯ থেকে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও চিকিৎসার বড় অংশের ব্যয় এখনো বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।

পেসমেকার কিনতেই ৯ লাখ, নিঃস্ব পরিবার

রাজশাহী মেডিকেল থেকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে মায়ের চিকিৎসার জন্য আসেন ৭৯ বছর বয়সী পিয়ারা বেগমের ছেলে ডালিম। তার মায়ের চিকিৎসায় মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

ডালিম জানান, শুধু আইসিডি ডিভাইস বা পেসমেকার কিনতেই খরচ হয়েছে ৯ লাখ টাকা। মায়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে জমিজমা ও পরিবারের একমাত্র গরুটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাদের।

এখন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব।

সরকারি সেবার দুর্বলতায় বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছে মানুষ

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সের সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও সেবার নানা দুর্বলতার কারণে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন।

বাড্ডার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার দিন ভর্তি থেকে সাধারণ হামের চিকিৎসা নিতে ২৯ বছর বয়সী নাজমুন নাহার তামান্নার খরচ হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালের সেবা কার্যকর না হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষও দ্রুত চিকিৎসার আশায় বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।

ওষুধের ৯৩ শতাংশই কিনতে হচ্ছে নিজের টাকায়

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সংকট হলো ওষুধের ব্যয়। ১৯৯৮ সালের সেক্টর প্রোগ্রামে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কখনো ৩০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়িত হয়নি।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ওষুধ সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কিনতে হয়।

অর্থাৎ ওষুধের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশই বহন করছেন রোগীরা

দরিদ্র পরিবারের আয়ের ৩৫% চলে যায় চিকিৎসায়

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা ব্যয় করতে হয়। যা পরিবারের মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

তবে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই চিকিৎসার পেছনে চলে যায়

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর ৬১ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন।

বাজেট নয়, ব্যবস্থাপনার সংকটও বড় কারণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রুমানা হকের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগও দ্রুত বাড়ছে।

আধুনিক চিকিৎসা, নতুন ওষুধ ও প্রযুক্তির কারণে চিকিৎসার ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও তা জনসংখ্যা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, বরাদ্দের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হওয়ায় প্রকৃত সেবা খাতে পৌঁছায় তুলনামূলকভাবে কম অর্থ।

দেশে মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেন। বাকি ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যবিমার অভাব এবং সরকারি হাসপাতালে অসংক্রামক রোগের সমন্বিত সেবার ঘাটতি মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য করছে।

দুর্নীতি বন্ধ না হলে বাজেট বাড়িয়েও লাভ নেই

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খানের মতে, শুধু বাজেট বা হাসপাতালের ভবন বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের সংকট দূর করা সম্ভব নয়।

তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও কেনাকাটানির্ভর নীতি বন্ধ করতে হবে। এসব সংস্কার ছাড়া স্বাস্থ্য বাজেট ৩ থেকে ৫ গুণ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না

তার মতে, স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় চলে যায়। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর ফল হিসেবে গজ, ব্যান্ডেজ থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত রোগীকেই কিনতে হচ্ছে। এতে আরও বাড়ছে রোগীর আউট-অব-পকেট এক্সপেন্ডিচার

উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চান বিশেষজ্ঞরা

অধ্যাপক সবুর খান মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। তার প্রস্তাব—উপজেলার সব বিশেষজ্ঞ পদ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চিকিৎসককে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া উচিত নয়।

এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ দুই শিফটে চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেবা চালু করা হলে রোগীরা বেশি সময় চিকিৎসাসেবা পাবেন এবং চিকিৎসকদের বৈকালিক প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রবণতাও কমতে পারে।

শেষ কথা

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অঙ্ক বড় হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমেনি। বরং ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও হাসপাতাল ব্যয়ের বড় অংশ এখনো রোগীর নিজের পকেট থেকেই যাচ্ছে।

তাই প্রশ্ন শুধু স্বাস্থ্য বাজেট কত তা নয়; বরং বরাদ্দের কতটা সরাসরি রোগীর চিকিৎসাসেবায় পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত