রাজশাহী শহরের পশ্চিম প্রান্তের রেললাইনের ধার ঘেঁষা কয়েকটি এলাকায় একসময় প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচার অভিযোগ ছিল। রাজপাড়া থানার আইডি বাগানপাড়া ও কাশিয়াডাঙ্গা থানার গুরিপাড়া ছিল এমন অভিযোগের মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যেত। এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতেন বাসিন্দারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগে বিভিন্ন অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাদকের বিস্তারের সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও বাড়তে থাকে বলে দাবি তাদের।
দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে এসব এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ অবস্থায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) নতুন কমিশনার হিসেবে গত ৭ মে ২০২৬ দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির।
দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। কোথায় মাদকের আড্ডা, কোথায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং কোথায় অনলাইন জুয়ার আসর—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন কমিশনার।
এরপর পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সিআরটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। মাদক, ছিনতাই, জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিশেষ দল মাঠে নামার পর আইডি বাগানপাড়া, গুরিপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন চিহ্নিত এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং অনলাইন জুয়ার সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
অপরাধ দমনে অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। আরএমপির বিভিন্ন থানায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় যেসব এলাকায় প্রকাশ্যে মাদকসেবী ও ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যেত, সেখানে এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আইডি বাগানপাড়া ও গুরিপাড়ায় মাদকের আড্ডা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের আনাগোনা আগের তুলনায় কমেছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ কমায় চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে রাতের চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানান তারা।
অভিযানের প্রভাব রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেও পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আল মামুনের তথ্য অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মাদক মামলার আসামির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় কারাগারে আবাসন সংকটও তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু মাঠপর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা মদদদাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
নগরবাসীর মতে, নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে রাজশাহীকে মাদক ও কিশোর অপরাধমুক্ত করার উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজশাহী শহরের পশ্চিম প্রান্তের রেললাইনের ধার ঘেঁষা কয়েকটি এলাকায় একসময় প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচার অভিযোগ ছিল। রাজপাড়া থানার আইডি বাগানপাড়া ও কাশিয়াডাঙ্গা থানার গুরিপাড়া ছিল এমন অভিযোগের মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যেত। এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতেন বাসিন্দারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগে বিভিন্ন অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাদকের বিস্তারের সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও বাড়তে থাকে বলে দাবি তাদের।
দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে এসব এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ অবস্থায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) নতুন কমিশনার হিসেবে গত ৭ মে ২০২৬ দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির।
দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। কোথায় মাদকের আড্ডা, কোথায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং কোথায় অনলাইন জুয়ার আসর—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন কমিশনার।
এরপর পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সিআরটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। মাদক, ছিনতাই, জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিশেষ দল মাঠে নামার পর আইডি বাগানপাড়া, গুরিপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন চিহ্নিত এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং অনলাইন জুয়ার সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
অপরাধ দমনে অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। আরএমপির বিভিন্ন থানায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় যেসব এলাকায় প্রকাশ্যে মাদকসেবী ও ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যেত, সেখানে এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আইডি বাগানপাড়া ও গুরিপাড়ায় মাদকের আড্ডা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের আনাগোনা আগের তুলনায় কমেছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ কমায় চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে রাতের চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানান তারা।
অভিযানের প্রভাব রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেও পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আল মামুনের তথ্য অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মাদক মামলার আসামির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় কারাগারে আবাসন সংকটও তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু মাঠপর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা মদদদাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
নগরবাসীর মতে, নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে রাজশাহীকে মাদক ও কিশোর অপরাধমুক্ত করার উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।
