রোববার, ১৭ মে ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

জাতীয়

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন, ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও উপকৃত হবে ১২০ উপজেলা

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন, ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও উপকৃত হবে ১২০ উপজেলা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য এই ব্যারাজ থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং প্রথম ধাপে দেশের চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে।

প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

গত বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।

কী থাকছে প্রকল্পে

প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৫০ ফুট উঁচু ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক, দুটি ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতু।

শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে জ্বালানিবিহীন প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।

লবণাক্ততা কমানো ও সুন্দরবন রক্ষা

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় প্রকল্পটি অত্যন্ত জরুরি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে কেওড়া গাছের ক্ষয় রোধেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফারাক্কার প্রভাব মোকাবিলার উদ্যোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী, খাল ও জলাধারে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নাব্য সংকট ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করতেই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ায় প্রকল্পটির সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুই ধাপে বাস্তবায়ন

প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার বেশি। অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন জটিলতা বিবেচনায় এটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপে মূল ব্যারাজ নির্মাণ, গড়াই-মধুমতী ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থার পুনঃখনন এবং জলবিদ্যুৎ স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

কৃষি, মৎস্য ও অর্থনীতিতে সম্ভাবনা

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন পর্যন্ত বাড়তে পারে।

প্রকল্প এলাকা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এতে খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলার মানুষ উপকৃত হবে।

এছাড়া ব্যারাজের করিডোরকে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের বহুমুখী অবকাঠামো হিসেবেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত

মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যারাজের উজানে নদীভাঙন এবং ভাটিতে অতিরিক্ত পলি জমার মতো হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল ঝুঁকি রয়েছে। উন্নত নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।

চেকপোস্ট

রোববার, ১৭ মে ২০২৬


পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন, ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও উপকৃত হবে ১২০ উপজেলা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য এই ব্যারাজ থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং প্রথম ধাপে দেশের চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে।

প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

গত বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।


কী থাকছে প্রকল্পে

প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৫০ ফুট উঁচু ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক, দুটি ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতু।

শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে জ্বালানিবিহীন প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।


লবণাক্ততা কমানো ও সুন্দরবন রক্ষা

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় প্রকল্পটি অত্যন্ত জরুরি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে কেওড়া গাছের ক্ষয় রোধেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ফারাক্কার প্রভাব মোকাবিলার উদ্যোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী, খাল ও জলাধারে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নাব্য সংকট ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করতেই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ায় প্রকল্পটির সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


দুই ধাপে বাস্তবায়ন

প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার বেশি। অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন জটিলতা বিবেচনায় এটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপে মূল ব্যারাজ নির্মাণ, গড়াই-মধুমতী ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থার পুনঃখনন এবং জলবিদ্যুৎ স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।


কৃষি, মৎস্য ও অর্থনীতিতে সম্ভাবনা

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন পর্যন্ত বাড়তে পারে।

প্রকল্প এলাকা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এতে খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলার মানুষ উপকৃত হবে।

এছাড়া ব্যারাজের করিডোরকে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের বহুমুখী অবকাঠামো হিসেবেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।


বিশেষজ্ঞদের মত

মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যারাজের উজানে নদীভাঙন এবং ভাটিতে অতিরিক্ত পলি জমার মতো হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল ঝুঁকি রয়েছে। উন্নত নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত