চাষের মাছেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের পুকুরের তলদেশের পলি ও ছয় প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করে এ দূষণের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। পরীক্ষায় পাঙাশ ও রুই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Environmental Pollution-এ প্রকাশিত হয়েছে।
১৫০টি মাছের পরিপাকতন্ত্রে ৯০টি কণা
গবেষণায় ত্রিশালের ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের খামার থেকে পুকুরের তলদেশের পলি এবং রুই, কাতলা, পাঙাশ, মৃগেল, কমন কার্প ও সরপুঁটি এই ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
মাছগুলোর পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ০.৬০টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পাঙাশ মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার ৪০ শতাংশ এবং রুই মাছে ৩৬ শতাংশ। কাতলা ও মৃগেলে এ হার ২০ শতাংশ করে এবং কমন কার্প ও সরপুঁটিতে ১৬ শতাংশ করে।
তবে প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে কণার গড় সংখ্যার হিসাবে সরপুঁটিতে সর্বোচ্চ ১.২০টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার এবং প্রতি মাছে কণার গড় সংখ্যা এক বিষয় নয়।
২৫টি পুকুরের পলিতেই দূষণের প্রমাণ
গবেষণায় পরীক্ষা করা ২৫টি পুকুরের তলদেশের পলির প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ১১.০৪টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি আধার হিসেবে কাজ করতে পারে। মাছ খাদ্য গ্রহণের সময় পলিতে জমে থাকা এসব কণা পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।
মাছের বসবাসের স্তরভেদেও দূষণের সংস্পর্শে আসার পার্থক্য দেখা গেছে। তলদেশে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার ৫২ শতাংশ, মধ্যস্তরের মাছের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ এবং উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।
প্লাস্টিকের ব্যাগ, জাল ও পাইপ সম্ভাব্য উৎস
মাছের পরিপাকতন্ত্রে শনাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে পলিপ্রোপিলিন ২৪ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ, পলিকার্বনেট ১৯ শতাংশ, সেলুলোজ অ্যাসিটেট ১৫ শতাংশ, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ১৩ শতাংশ এবং পলিইথিলিন ৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, পুকুরের পলিতে পলিইথিলিনের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৩৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, ২৭ শতাংশ।
গবেষকদের বিশ্লেষণে মাছের খাদ্যের প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিং, মাছ ধরার নাইলন ও পলিয়েস্টারের জাল, পুকুরের পাড়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ত্রিপল এবং সেচের প্লাস্টিকের পাইপের ক্ষয়কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাছ খেলে মানবদেহে কতটা প্লাস্টিক যায়?
মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তবে এই গবেষণার ফল থেকে মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খান জানান, গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করা হলেও মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। তাই এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কেও এ গবেষণা থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তিনি ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাব পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেন।
দূষণ কমাতে যে পদক্ষেপ জরুরি
গবেষকদের মতে, মাছের খামারে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগ ও জাল যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা জরুরি। পাশাপাশি পুকুরের পানি ও তলদেশের পলির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
ত্রিশালের এই গবেষণা বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের উপস্থিতি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে মাছের স্বাস্থ্য, জলজ পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
চাষের মাছেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের পুকুরের তলদেশের পলি ও ছয় প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করে এ দূষণের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। পরীক্ষায় পাঙাশ ও রুই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Environmental Pollution-এ প্রকাশিত হয়েছে।
১৫০টি মাছের পরিপাকতন্ত্রে ৯০টি কণা
গবেষণায় ত্রিশালের ২৫টি বাণিজ্যিক মাছের খামার থেকে পুকুরের তলদেশের পলি এবং রুই, কাতলা, পাঙাশ, মৃগেল, কমন কার্প ও সরপুঁটি এই ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
মাছগুলোর পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ০.৬০টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পাঙাশ মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার ৪০ শতাংশ এবং রুই মাছে ৩৬ শতাংশ। কাতলা ও মৃগেলে এ হার ২০ শতাংশ করে এবং কমন কার্প ও সরপুঁটিতে ১৬ শতাংশ করে।
তবে প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে কণার গড় সংখ্যার হিসাবে সরপুঁটিতে সর্বোচ্চ ১.২০টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার হার এবং প্রতি মাছে কণার গড় সংখ্যা এক বিষয় নয়।
২৫টি পুকুরের পলিতেই দূষণের প্রমাণ
গবেষণায় পরীক্ষা করা ২৫টি পুকুরের তলদেশের পলির প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ১১.০৪টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি আধার হিসেবে কাজ করতে পারে। মাছ খাদ্য গ্রহণের সময় পলিতে জমে থাকা এসব কণা পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।
মাছের বসবাসের স্তরভেদেও দূষণের সংস্পর্শে আসার পার্থক্য দেখা গেছে। তলদেশে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার ৫২ শতাংশ, মধ্যস্তরের মাছের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ এবং উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।
প্লাস্টিকের ব্যাগ, জাল ও পাইপ সম্ভাব্য উৎস
মাছের পরিপাকতন্ত্রে শনাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে পলিপ্রোপিলিন ২৪ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ, পলিকার্বনেট ১৯ শতাংশ, সেলুলোজ অ্যাসিটেট ১৫ শতাংশ, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ১৩ শতাংশ এবং পলিইথিলিন ৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, পুকুরের পলিতে পলিইথিলিনের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৩৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, ২৭ শতাংশ।
গবেষকদের বিশ্লেষণে মাছের খাদ্যের প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিং, মাছ ধরার নাইলন ও পলিয়েস্টারের জাল, পুকুরের পাড়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ত্রিপল এবং সেচের প্লাস্টিকের পাইপের ক্ষয়কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাছ খেলে মানবদেহে কতটা প্লাস্টিক যায়?
মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তবে এই গবেষণার ফল থেকে মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. বদিউজ্জামান খান জানান, গবেষণায় মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করা হলেও মানুষের খাওয়ার উপযোগী মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। তাই এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কেও এ গবেষণা থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তিনি ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাছের পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাব পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেন।
দূষণ কমাতে যে পদক্ষেপ জরুরি
গবেষকদের মতে, মাছের খামারে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগ ও জাল যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা জরুরি। পাশাপাশি পুকুরের পানি ও তলদেশের পলির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
ত্রিশালের এই গবেষণা বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের উপস্থিতি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে মাছের স্বাস্থ্য, জলজ পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
