বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রকল্প দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার রেলপথ এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা চ্যালেঞ্জ, ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্প দেশের রেল যোগাযোগে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ে প্রশাসনিক সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিনের ভূমিকা সংশ্লিষ্ট মহলে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় "দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ" প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে পরবর্তীতে প্রকল্প সংশোধন, নকশা পরিবর্তন, সময় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনায় রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত আরও প্রায় ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের লক্ষ্য ছিল, যা ভবিষ্যতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের অস্থিতিশীল সীমান্ত পরিস্থিতি, আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগে অগ্রগতির অভাব এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ওই অংশটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দুটি প্যাকেজে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম আইকনিক কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন রেলস্টেশন, অসংখ্য সেতু, কালভার্ট এবং আধুনিক রেল অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথটির উদ্বোধন করেন, যার মাধ্যমে দেশের দীর্ঘতম নতুন রেলপথ যাত্রা শুরু করে।
দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ে ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে সুবক্তগিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন তদারকি, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাঁর দায়িত্বকালেই রামু–গুন্দুম অংশের প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের আর্থিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় ওই অংশটি মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। এর ফলে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পটি আরও বাস্তবসম্মত কাঠামোয় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ কেবল একটি নতুন রেললাইন নয়; এটি দেশের পর্যটন শিল্প, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রামু–গুন্দুম অংশ পুনরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযুক্তির সম্ভাবনাও নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রকল্প দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার রেলপথ এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা চ্যালেঞ্জ, ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্প দেশের রেল যোগাযোগে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ে প্রশাসনিক সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিনের ভূমিকা সংশ্লিষ্ট মহলে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় "দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ" প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে পরবর্তীতে প্রকল্প সংশোধন, নকশা পরিবর্তন, সময় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনায় রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত আরও প্রায় ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের লক্ষ্য ছিল, যা ভবিষ্যতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের অস্থিতিশীল সীমান্ত পরিস্থিতি, আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগে অগ্রগতির অভাব এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ওই অংশটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দুটি প্যাকেজে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম আইকনিক কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন রেলস্টেশন, অসংখ্য সেতু, কালভার্ট এবং আধুনিক রেল অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথটির উদ্বোধন করেন, যার মাধ্যমে দেশের দীর্ঘতম নতুন রেলপথ যাত্রা শুরু করে।
দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পটির শেষ পর্যায়ে ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে সুবক্তগিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন তদারকি, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাঁর দায়িত্বকালেই রামু–গুন্দুম অংশের প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের আর্থিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় ওই অংশটি মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। এর ফলে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পটি আরও বাস্তবসম্মত কাঠামোয় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ কেবল একটি নতুন রেললাইন নয়; এটি দেশের পর্যটন শিল্প, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রামু–গুন্দুম অংশ পুনরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযুক্তির সম্ভাবনাও নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।
