শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

সারাদেশ

স্কুল বাঁচাতে লড়ছেন রেখা রানী

বিয়ে না করে জীবনের সঞ্চয় দিয়ে গ্রামের মেয়েদের জন্য তৈরি করলেন স্কুল

বিয়ে না করে জীবনের সঞ্চয় দিয়ে গ্রামের মেয়েদের জন্য তৈরি করলেন স্কুল
কুমারী রেখা রানী গার্লস হাইস্কুল। ছবি : চেকপোস্ট

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার প্রত্যন্ত বুরুয়া গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে নিজের জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন অবসরপ্রাপ্ত নার্স কুমারী রেখা রানী ওঝা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কুমারী রেখা রানী গার্লস হাইস্কুল’ এখন এলাকার দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনার অন্যতম আশ্রয়।

২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে ছিল টিনশেডের ছোট্ট ঘর আর মাত্র একজন ছাত্রী। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক রয়েছেন নয়জন। সরকারি অর্থায়নে ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের একটি একতলা ভবনও নির্মিত হয়েছে।

শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি রেখা রানী। দূরবর্তী এলাকার মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য বিদ্যালয়ের পাশে একটি হোস্টেলও গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কয়েকজন সেখানে থেকে তাঁর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

নিজের জীবনসংগ্রাম থেকেই শিক্ষার স্বপ্ন

১৯৪৮ সালে জন্ম নেওয়া রেখা রানীর শৈশবও ছিল নানা বাধায় ভরা। একাধিকবার তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন পরিবার। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও নিজের দৃঢ়তার কারণে তিনি থেমে যাননি। কখনো আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে, কখনো অন্যের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।

পরবর্তী সময়ে ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করে নার্সিং পেশায় যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে ২০১১ সালে মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অবসর নেন।

অবসরের পর পাওয়া পেনশনের অর্থ দিয়ে জমি কিনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময়ের উপার্জন ও সঞ্চয়ের বড় অংশই ব্যয় করেছেন মেয়েদের জন্য এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ

বিদ্যালয়ের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছাত্রী পাওয়ার জন্য একসময় নিজেই বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন রেখা রানী। দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন মেয়েদের পড়াশোনার গুরুত্ব। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, বাল্যবিয়ের কারণে যেন এলাকার মেয়েদের শিক্ষাজীবন থেমে না যায়।

বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় অভিভাবকেরা যে পরিমাণ অর্থ দিতে পারেন, সেটিই নেওয়া হয়। সরকারি নিবন্ধন ও পরীক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন নেওয়া হয় না।

রেখা রানীর ভাষ্য, এই এলাকার অনেক পরিবারই দরিদ্র। মেয়েরা একটু বড় হলেই অভিভাবকেরা বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই যেকোনোভাবে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রেখে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

শিক্ষকদের বেতন দেওয়াই এখন বড় সংকট

একসময় নিজের সামর্থ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের ব্যয় চালালেও এখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেই দায়িত্ব পালন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। নিজের সঞ্চয়ও প্রায় শেষ।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শুরু থেকেই এমপিওভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনা বেতনে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় অনেক শিক্ষককে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। সরকারি চাকরি পেলে তাঁদের চলে যাওয়ার বিষয়টিকেও স্বাভাবিকভাবেই দেখেন রেখা রানী।

বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছেন তিনি। তবে এ জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয় বলে জানিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন।

ছাত্রীদের খাবারেও অভিভাবকদের সহযোগিতা

চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ২৬ জন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন হোস্টেলে থেকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে।

হোস্টেলে থাকা মেয়েদের খাবারের ব্যয়ও সবসময় বিদ্যালয়ের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। তাই যেসব পরিবারের বাড়িতে শাকসবজি হয়, তাদের মেয়েদের জন্য সেসব খাবার পাঠাতে বলা হয়েছে। কেউ চাল, কেউ ডাল, আবার কেউ সবজি পাঠান। অভিভাবকদের সহযোগিতায় এভাবেই অনেকটা কষ্ট করে চলছে হোস্টেলের ব্যবস্থা।

নিজের খরচ চালাতেও করেছেন নানা কাজ

রেখা রানীর জীবন শুধু চাকরি আর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্প নয়। নিজের জীবিকা ও অন্যদের সহযোগিতা করতে তিনি একসময় যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। ওষুধের দোকানও চালিয়েছেন। জীবনে অনেক ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

নিজের জীবনযাত্রার জন্য তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি এ কথাও জানিয়েছেন রেখা রানী। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করা তাঁর একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির একটি কোণেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা। ঢাকায় গেলে থাকেন ভাইয়ের বাসায়। নিজের নামে এখন তেমন সঞ্চয় নেই। প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমিই তাঁর অবশিষ্ট সম্পদের বড় অংশ।

দত্তক মেয়ের কাছেও তিনি ‘মামণি’

রেখা রানী বিয়ে করেননি। তবে চন্দনা রানী বৈদ্য নামে এক মেয়েকে তিনি দত্তক নিয়ে বড় করেছেন। চন্দনার নিজের মা মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আশ্রয় না পেয়ে চন্দনা রেখা রানীর কাছে চলে আসেন।

ঢাকায় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন চন্দনা। বর্তমানে টিউশনি করার পাশাপাশি চাকরির চেষ্টা করছেন।

চন্দনার কাছে রেখা রানী শুধু অভিভাবক নন, তাঁর ‘মামণি’। তিনি বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পুরো সংগ্রামের সাক্ষী তিনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন—এ দৃশ্য দেখে যেতে পারলে রেখা রানী সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হবেন।

অভাবের সংসারে কখনো কখনো খাবারের সংকটও দেখা দেয়। তবু বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ ও গ্রামের মেয়েদের কথা ভেবে তাঁরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফলাফলও আশাব্যঞ্জক

শুধু আবেগ বা মানবিকতার জায়গা থেকে নয়, শিক্ষার ফলাফলেও বিদ্যালয়টি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টির জেএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৪ শতাংশ। ২০২১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৯ শতাংশ এবং পরের বছর তা শতভাগে পৌঁছায়।

চিকিৎসার কারণে গত বছর ভারতে থাকায় বিদ্যালয়ের ফলাফল কিছুটা খারাপ হয়েছিল বলে জানান রেখা রানী। তবে চলতি বছরের ফলাফল নিয়ে তিনি আশাবাদী।

স্বপ্ন ছিল অন্য কিছু, এখন স্বপ্ন মেয়েদের ঘিরে

নিজে একসময় কলেজের অধ্যাপক কিংবা বড় কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন রেখা রানী। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে এখন তাঁর স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু বিদ্যালয়ের মেয়েরা।

তিনি চান, এই বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে গ্রামের মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াক, ভালো পেশায় যুক্ত হোক এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করুক।

কোটালীপাড়ার কলাবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইনজীবী বিজন বিশ্বাস বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয়টির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রেখা রানী চাকরিজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। বিদ্যালয়ের জন্য তাঁর অবদান স্থানীয় মানুষ জানেন।

গোপালগঞ্জের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ সিদ্দিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করলে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

‘আমার কথা নয়, স্কুলটির কষ্টটা দূর করুন’

নিজের জীবনের গল্প বলতে এখন আর আগ্রহী নন রেখা রানী। তাঁর কাছে নিজের কষ্টের চেয়ে বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎই বড়।

সম্প্রতি ক্যামেরার সামনে নিজের বিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া তাঁর আকুতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাঁর আবেদন বিদ্যালয়টি যেন টিকে থাকে, শিক্ষকরা যেন বেতন পান এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্য বড় কোনো দাবি নেই রেখা রানীর। তাঁর একমাত্র চাওয়া, নিজের হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি যেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও টিকে থাকে এবং গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার পথটি যেন বন্ধ না হয়।

‘আমার জীবনটা কষ্টের। সেই কষ্টের কথা শুনে কী করবেন? আমার স্কুলটির কষ্টটা যাতে দূর হয়, তেমন কিছু করেন’ রেখা রানীর এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে তাঁর পুরো জীবনের গল্প।

#রেখারানীরস্কুল #কন্যাশিক্ষা #মানবিকগল্প

চেকপোস্ট

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


বিয়ে না করে জীবনের সঞ্চয় দিয়ে গ্রামের মেয়েদের জন্য তৈরি করলেন স্কুল

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার প্রত্যন্ত বুরুয়া গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে নিজের জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন অবসরপ্রাপ্ত নার্স কুমারী রেখা রানী ওঝা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কুমারী রেখা রানী গার্লস হাইস্কুল’ এখন এলাকার দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনার অন্যতম আশ্রয়।


২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে ছিল টিনশেডের ছোট্ট ঘর আর মাত্র একজন ছাত্রী। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক রয়েছেন নয়জন। সরকারি অর্থায়নে ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের একটি একতলা ভবনও নির্মিত হয়েছে।


শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি রেখা রানী। দূরবর্তী এলাকার মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য বিদ্যালয়ের পাশে একটি হোস্টেলও গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কয়েকজন সেখানে থেকে তাঁর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।


নিজের জীবনসংগ্রাম থেকেই শিক্ষার স্বপ্ন


১৯৪৮ সালে জন্ম নেওয়া রেখা রানীর শৈশবও ছিল নানা বাধায় ভরা। একাধিকবার তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন পরিবার। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও নিজের দৃঢ়তার কারণে তিনি থেমে যাননি। কখনো আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে, কখনো অন্যের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।


পরবর্তী সময়ে ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করে নার্সিং পেশায় যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে ২০১১ সালে মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অবসর নেন।


অবসরের পর পাওয়া পেনশনের অর্থ দিয়ে জমি কিনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময়ের উপার্জন ও সঞ্চয়ের বড় অংশই ব্যয় করেছেন মেয়েদের জন্য এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে।


বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ


বিদ্যালয়ের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছাত্রী পাওয়ার জন্য একসময় নিজেই বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন রেখা রানী। দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন মেয়েদের পড়াশোনার গুরুত্ব। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, বাল্যবিয়ের কারণে যেন এলাকার মেয়েদের শিক্ষাজীবন থেমে না যায়।


বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় অভিভাবকেরা যে পরিমাণ অর্থ দিতে পারেন, সেটিই নেওয়া হয়। সরকারি নিবন্ধন ও পরীক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন নেওয়া হয় না।


রেখা রানীর ভাষ্য, এই এলাকার অনেক পরিবারই দরিদ্র। মেয়েরা একটু বড় হলেই অভিভাবকেরা বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই যেকোনোভাবে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রেখে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।


শিক্ষকদের বেতন দেওয়াই এখন বড় সংকট


একসময় নিজের সামর্থ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের ব্যয় চালালেও এখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেই দায়িত্ব পালন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। নিজের সঞ্চয়ও প্রায় শেষ।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শুরু থেকেই এমপিওভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনা বেতনে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় অনেক শিক্ষককে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। সরকারি চাকরি পেলে তাঁদের চলে যাওয়ার বিষয়টিকেও স্বাভাবিকভাবেই দেখেন রেখা রানী।

বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছেন তিনি। তবে এ জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয় বলে জানিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন।

ছাত্রীদের খাবারেও অভিভাবকদের সহযোগিতা

চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ২৬ জন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন হোস্টেলে থেকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে।

হোস্টেলে থাকা মেয়েদের খাবারের ব্যয়ও সবসময় বিদ্যালয়ের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। তাই যেসব পরিবারের বাড়িতে শাকসবজি হয়, তাদের মেয়েদের জন্য সেসব খাবার পাঠাতে বলা হয়েছে। কেউ চাল, কেউ ডাল, আবার কেউ সবজি পাঠান। অভিভাবকদের সহযোগিতায় এভাবেই অনেকটা কষ্ট করে চলছে হোস্টেলের ব্যবস্থা।


নিজের খরচ চালাতেও করেছেন নানা কাজ


রেখা রানীর জীবন শুধু চাকরি আর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্প নয়। নিজের জীবিকা ও অন্যদের সহযোগিতা করতে তিনি একসময় যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। ওষুধের দোকানও চালিয়েছেন। জীবনে অনেক ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

নিজের জীবনযাত্রার জন্য তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি এ কথাও জানিয়েছেন রেখা রানী। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করা তাঁর একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির একটি কোণেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা। ঢাকায় গেলে থাকেন ভাইয়ের বাসায়। নিজের নামে এখন তেমন সঞ্চয় নেই। প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমিই তাঁর অবশিষ্ট সম্পদের বড় অংশ।

দত্তক মেয়ের কাছেও তিনি ‘মামণি’

রেখা রানী বিয়ে করেননি। তবে চন্দনা রানী বৈদ্য নামে এক মেয়েকে তিনি দত্তক নিয়ে বড় করেছেন। চন্দনার নিজের মা মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আশ্রয় না পেয়ে চন্দনা রেখা রানীর কাছে চলে আসেন।

ঢাকায় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন চন্দনা। বর্তমানে টিউশনি করার পাশাপাশি চাকরির চেষ্টা করছেন।

চন্দনার কাছে রেখা রানী শুধু অভিভাবক নন, তাঁর ‘মামণি’। তিনি বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পুরো সংগ্রামের সাক্ষী তিনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন—এ দৃশ্য দেখে যেতে পারলে রেখা রানী সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হবেন।

অভাবের সংসারে কখনো কখনো খাবারের সংকটও দেখা দেয়। তবু বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ ও গ্রামের মেয়েদের কথা ভেবে তাঁরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।


ফলাফলও আশাব্যঞ্জক


শুধু আবেগ বা মানবিকতার জায়গা থেকে নয়, শিক্ষার ফলাফলেও বিদ্যালয়টি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টির জেএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৪ শতাংশ। ২০২১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৯ শতাংশ এবং পরের বছর তা শতভাগে পৌঁছায়।

চিকিৎসার কারণে গত বছর ভারতে থাকায় বিদ্যালয়ের ফলাফল কিছুটা খারাপ হয়েছিল বলে জানান রেখা রানী। তবে চলতি বছরের ফলাফল নিয়ে তিনি আশাবাদী।


স্বপ্ন ছিল অন্য কিছু, এখন স্বপ্ন মেয়েদের ঘিরে


নিজে একসময় কলেজের অধ্যাপক কিংবা বড় কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন রেখা রানী। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে এখন তাঁর স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু বিদ্যালয়ের মেয়েরা।

তিনি চান, এই বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে গ্রামের মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াক, ভালো পেশায় যুক্ত হোক এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করুক।

কোটালীপাড়ার কলাবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইনজীবী বিজন বিশ্বাস বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয়টির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রেখা রানী চাকরিজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। বিদ্যালয়ের জন্য তাঁর অবদান স্থানীয় মানুষ জানেন।

গোপালগঞ্জের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ সিদ্দিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করলে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

‘আমার কথা নয়, স্কুলটির কষ্টটা দূর করুন’

নিজের জীবনের গল্প বলতে এখন আর আগ্রহী নন রেখা রানী। তাঁর কাছে নিজের কষ্টের চেয়ে বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎই বড়।

সম্প্রতি ক্যামেরার সামনে নিজের বিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া তাঁর আকুতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাঁর আবেদন বিদ্যালয়টি যেন টিকে থাকে, শিক্ষকরা যেন বেতন পান এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্য বড় কোনো দাবি নেই রেখা রানীর। তাঁর একমাত্র চাওয়া, নিজের হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি যেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও টিকে থাকে এবং গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার পথটি যেন বন্ধ না হয়।

‘আমার জীবনটা কষ্টের। সেই কষ্টের কথা শুনে কী করবেন? আমার স্কুলটির কষ্টটা যাতে দূর হয়, তেমন কিছু করেন’ রেখা রানীর এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে তাঁর পুরো জীবনের গল্প।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত