শেখ শাহাউর রহমান বেলাল::
হবিগঞ্জের মানুষের কাছে খোয়াই নদী শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, জীবিকা ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নদীকে ঘিরে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ও অভিযোগ চললেও সেগুলোর কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা যায়নি-এমন অভিযোগ বহুদিনের। সাম্প্রতিক নদীভাঙন ও বন্যা সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম আছে। নদীরও একটি স্বাভাবিক প্রবাহ, গভীরতা, তীর এবং ভারসাম্য রয়েছে। যখন সেই ভারসাম্য বারবার নষ্ট হয়, তখন প্রকৃতি একসময় তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। অতিবৃষ্টি বা উজানের ঢল প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে, কিন্তু সেই পানি কতটা ভয়াবহ রূপ নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে নদীর ধারণক্ষমতা, তীরের স্থিতিশীলতা এবং নদী ব্যবস্থাপনার ওপর।
খোয়াই নদীকে ঘিরে বহু বছর ধরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও ড্রেজার মেশিন, কোথাও এক্সকাভেটর দিয়ে নদীর তলদেশ ও তীর থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছে, জরিমানা করেছে, এমনকি কারাদণ্ডও দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যদি এসব অভিযান স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা?
আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়। যদি একই ধরনের অভিযোগ বছরের পর বছর চলতেই থাকে, তাহলে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা।
নদী কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়। নদী একটি জাতীয় সম্পদ। তাই এর ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করে না, বরং কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সম্প্রতি খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, হাজারো পরিবার মানবিক সংকটে পড়েছে। দুর্যোগের সময় সরকারের ত্রাণ কার্যক্রম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ত্রাণের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা। অন্যথায় প্রকৃত অসহায় মানুষ বঞ্চিত হন এবং সুযোগসন্ধানীরা সুবিধা নিয়ে যায়।
কিন্তু ত্রাণ কখনোই সমাধান নয়; এটি কেবল সাময়িক সহায়তা। প্রকৃত সমাধান হলো দুর্যোগের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা।
খোয়াই নদীকে ঘিরে এখন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে। নদীর সীমানা ও প্রাকৃতিক প্রবাহ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নদীর মানচিত্র অনুযায়ী পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল ও বালু-মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন-এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টায় এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের পর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। একইভাবে নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সচেতন জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া নদী রক্ষা আন্দোলন সফল হতে পারে না। কারণ নদী রক্ষার লড়াই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার লড়াই নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।
আজকের এই নদীভাঙন আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনও শিক্ষা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় অবহেলা কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের সুযোগ আর দেওয়া যায় না।
আজ প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, দায়িত্বশীল উদ্যোগের। প্রয়োজন নদীকে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার। প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহিতা এবং জনসম্পৃক্ততা।
খোয়াই নদী শুধু হবিগঞ্জের নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সম্পদ। নদীকে বাঁচানো মানে কৃষিকে বাঁচানো, পরিবেশকে বাঁচানো, জনপদকে বাঁচানো এবং মানুষের জীবন-জীবিকাকে নিরাপদ রাখা।
নদীকে যদি আমরা রক্ষা করি, নদীও আমাদের রক্ষা করবে। আর যদি নদীর প্রতি অবহেলা চলতেই থাকে, তাহলে নদীভাঙন, বন্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের মূল্য আমাদেরই দিতে হবে-বারবার।

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল::
হবিগঞ্জের মানুষের কাছে খোয়াই নদী শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, জীবিকা ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নদীকে ঘিরে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ও অভিযোগ চললেও সেগুলোর কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা যায়নি-এমন অভিযোগ বহুদিনের। সাম্প্রতিক নদীভাঙন ও বন্যা সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম আছে। নদীরও একটি স্বাভাবিক প্রবাহ, গভীরতা, তীর এবং ভারসাম্য রয়েছে। যখন সেই ভারসাম্য বারবার নষ্ট হয়, তখন প্রকৃতি একসময় তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। অতিবৃষ্টি বা উজানের ঢল প্রাকৃতিক ঘটনা হতে পারে, কিন্তু সেই পানি কতটা ভয়াবহ রূপ নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে নদীর ধারণক্ষমতা, তীরের স্থিতিশীলতা এবং নদী ব্যবস্থাপনার ওপর।
খোয়াই নদীকে ঘিরে বহু বছর ধরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও ড্রেজার মেশিন, কোথাও এক্সকাভেটর দিয়ে নদীর তলদেশ ও তীর থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছে, জরিমানা করেছে, এমনকি কারাদণ্ডও দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যদি এসব অভিযান স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা?
আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়। যদি একই ধরনের অভিযোগ বছরের পর বছর চলতেই থাকে, তাহলে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা।
নদী কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়। নদী একটি জাতীয় সম্পদ। তাই এর ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করে না, বরং কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সম্প্রতি খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, হাজারো পরিবার মানবিক সংকটে পড়েছে। দুর্যোগের সময় সরকারের ত্রাণ কার্যক্রম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ত্রাণের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা। অন্যথায় প্রকৃত অসহায় মানুষ বঞ্চিত হন এবং সুযোগসন্ধানীরা সুবিধা নিয়ে যায়।
কিন্তু ত্রাণ কখনোই সমাধান নয়; এটি কেবল সাময়িক সহায়তা। প্রকৃত সমাধান হলো দুর্যোগের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা।
খোয়াই নদীকে ঘিরে এখন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে। নদীর সীমানা ও প্রাকৃতিক প্রবাহ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নদীর মানচিত্র অনুযায়ী পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল ও বালু-মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন-এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টায় এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের পর যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। একইভাবে নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সচেতন জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া নদী রক্ষা আন্দোলন সফল হতে পারে না। কারণ নদী রক্ষার লড়াই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার লড়াই নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।
আজকের এই নদীভাঙন আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনও শিক্ষা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় অবহেলা কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের সুযোগ আর দেওয়া যায় না।
আজ প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, দায়িত্বশীল উদ্যোগের। প্রয়োজন নদীকে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার। প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহিতা এবং জনসম্পৃক্ততা।
খোয়াই নদী শুধু হবিগঞ্জের নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সম্পদ। নদীকে বাঁচানো মানে কৃষিকে বাঁচানো, পরিবেশকে বাঁচানো, জনপদকে বাঁচানো এবং মানুষের জীবন-জীবিকাকে নিরাপদ রাখা।
নদীকে যদি আমরা রক্ষা করি, নদীও আমাদের রক্ষা করবে। আর যদি নদীর প্রতি অবহেলা চলতেই থাকে, তাহলে নদীভাঙন, বন্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের মূল্য আমাদেরই দিতে হবে-বারবার।
