বৃহত্তর খুলনায় উচ্চশিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল ( বিএল) কলেজ। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিন- পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের হ্নদয়ের ও মননে দীর্ঘ দিন ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ৪১ একর জমির ওপর দাড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২৩টি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে ২১ টি বিভাগে অনার্স এবং ২২ টি বিভাগে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে।
শতবর্ষের ঐতিহ্য ধারন করা কলেজটিতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগলেও রয়েছে নানা সংকট। শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি আবাসিক হোস্টেল থাকলেও ছেলেদের পাঁচটি হোস্টেলই পরিত্যাক্ত। মেয়েদের দুটি হোস্টেল চালু রয়েছে এবং আরেকটি সংস্কারের শেষে চালুর অপেক্ষায়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা সীমিত হয়ে পড়েছে।
তবে পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও কলেজটির রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। বিএল কলেজ থিয়েটার, ডিবেটিং ক্লাব, আবৃত্তি সংগঠন " বায়ান্ন" সহ বিভিন্ন সংস্কৃতি সংগঠন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জীবনমুখী শিক্ষার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ক্লাব। কলেজের গ্রহ্নাগারে রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি বই। ভৈরব তীরে যাত্রা শুরু : খুলনা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দুরে দৌলতপুর ভৈরব নদের তীরে দুটি টিনসেড ঘর নিয়ে ১৯০২ সালের ২৭ জুলাই কলকাতার হিন্দু কলেজের আদলে প্রতিষ্ঠিত হয় বিএল কলেজ। শুরুতে এর নাম ছিল " হিন্দু একাডেমি "।
প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাটের বাউডাঙ্গার জমিদার এবং তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ব্রজলাল চক্রবর্তী ( শাস্ত্রী) । সংস্কৃতি, ইংরেজি সাহিত্য ও আইন বিষয়ে পন্ডিত এই বিদ্যানুরাগীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের আর্থিক সহায়তা ও সমর্থনে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০২ সালের ৩ জুলাই কলেজের দাপ্তরিক কাযক্রম শুরু হলেও পাঠদান শুরু হয় ২৭ জুলাই। শুরুতে সম্পুর্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানটি " চতুস্পাঠী" ও " একাডেমি" নামে দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল।
চতুস্পাঠীর শিক্ষার্থীদের খাবার, পড়াশোনা ও আবাসনের খরচ প্রতিষ্ঠান থেকেই বহন করা হতো। ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯১২ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানবীর হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের সৈয়দপুর এস্টেট থেকে ৪০ একর জমি কলেজকে দান করা হয়। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা ব্রজলালের মৃত্যুর পর কলেজটির নামকরন করা হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমি।
পরে একাডেমিকে কলেজে উন্নীত করা হয় এবং সংক্ষপে নাম হয় বিএল কলেজ। ১৯৬৭ সালের ১ লা জুলাই এটি সরকারি কলেজে পরিনত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৯ জন ছাত্র নিয়ে এফএ ( ফাস্ট আর্টস) শ্রেনীর পাঠদান শুরু হয়। আবাসিক কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ছিল অভিভক্ত বঙ্গদেশের প্রথম কলেজ গুলোর একটি। তখন অধ্যক্ষসহ শিক্ষক ছিলেন চারজন। প্রতিষ্ঠার প্রথম সাত বছর শুধু উচ্চবর্নের হিন্দু ছাত্ররা এখানে পড়ার সুযোগ পেতেন। শুরুতে মুসলিম ও নিন্ম বর্নের হিন্দুদের ভর্তির সুযোগ ছিল না।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই ৩৪ বছর : দক্ষিন- পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই বিদ্যাপীঠে ৪৩ বছর ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক শীর্ষ নেতা এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রয়াত অনেক নেতা এই কলেজ থেকে তাদের রাজনৈতিক জীবনের সুচনা করেছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ দিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গনতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন তারা। নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় একদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরার কার্যকর মাধ্যম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে।
এর পরের বছর, ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংসদের জিএস শিবির নেতা মুন্সি আব্দুল হালিম এবং সাহিত্য সম্পাদক শেখ রহমত আলীকে কলেজ ক্যাম্পাসে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এর জেরে পরে বিএল কলেজ ছাত্রদল নেতা আবুল কালাম আজাদকেও হত্যা করা হয়। ঔই দিনই বিএল কলেজ ছাত্র সংসদ বন্ধ এবং ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতি চালু হলেও ছাত্র সংসদ আর চালু হয়নি।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিএল কলেজ শাখার সিনিয়র সহ - সভাপতি হামিদুর রহমান শোভন বলেন, দক্ষিনবঙ্গের বৃহত্তম উচ্চ শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান সরকারি বিএল কলেজ। এখানে ছাত্র সংসদ আছে, কিন্তু সুদীর্ঘ বছর ধরে নির্বাচন হয়না। আমরা মনে করি এই মুহুর্তে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন। এতে নতুন নেতৃত্ব আসবে।
তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়ত রয়েছে, যা ছাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। ভবন কেন্দ্রিক সিসিটিভি থাকলেও মাঠ, সড়ক ও খোলা জায়গাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপন করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের হল গুলোও দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। কলেজের শিক্ষার্থী স্মৃতি রায় বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যে প্রতিনিধিরা উঠে আসেন, তারা কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন।
গনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিবছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। সাহিত্য - সংস্কৃতিতেও সরব ক্যাম্পাস : শুরু পড়াশুনা নয়, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিতেও সরব বিএল কলেজ ক্যাম্পাস। আবৃত্তি সংগঠন " বায়ান্ন" নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদিকে দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে " বিএল কলেজ জার্নাল"।
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় প্রকাশিত এই জার্নালে ভাষা ও সাহিত্য, শিল্প - সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কলেজের শিক্ষক গবেষকেরা লিখছেন। বছরে দুটি করে এখন পর্যন্ত জার্নালের ৮টি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে। গত মার্চে প্রকাশিত হয়েছে কলেজের বার্ষিকী " বিহঙ্গ'র শতবর্ষ সংখ্যা।
যশোর- খুলনার ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের লেখক অধ্যাপক সতীশচন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় ১৯২৩ সালে প্রথম " দেবায়তন " নামে কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ১৯২৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একশ বছরের লেখা থেকে বাছাই করে নির্বাচিত কলেজ ম্যাগাজিন ( ১৯২৩-২০২৩) প্রকাশিত হয়েছে গত জুনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের "ফ্রেভার দিতে ২৫০ কেটি টাকার পরিকল্পনা : কলেজটির বর্তমান অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশকে আরো আধুনিক করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি বিএল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রেভার দিতে একটি মাস্টারপ্লান করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে। অধ্যক্ষ বলেন, এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেভারে চলে আসবে। তিনি জানান, মাস্তারপ্লানে পাঠাগার জন্য পানি শোধনাগার নির্মান, আধুনিক বিজ্ঞান ভবন, মাল্টিপারপাস ১০তলা ভবন,পরিবহন সুবিধা বাড়ানো, হোস্টেল সংস্কার ও নতুন আবাসন ব্যবস্থা, শিক্ষক - কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য যানবাহন, প্রশাসনিক কাজের জন্য গাড়ি, মসজিদ কমপ্লেক্স, পুকুর ও মাঠ সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে পরিবহনের জন্য ৬টি বাস থেকে সংখ্যা বাড়িয়ে ২০ টি বাসে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাচটি হোস্টেলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করার কথাও ভাবা হচ্ছে। ১৯১ জন শিক্ষকের যাতায়াতের জন্য ৩৬ আসনের একটি এসি কোস্টার এবং প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, গত বছরের নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখতে পান কলেজের পাঁচটি ছেলেদের হলের মধ্যে তিনটি পরিত্যাক্ত এবং দুটি সংস্কার প্রয়োজন। তিনি জানান,তিতুমীর হল সংস্কারের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুমোদন হয়েছে।
এর মধ্যে কাজ শুরুর জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয় এবং টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। তবে তার মতে, সংস্কার হলেও তিতুমীর হল পুরোপুরি ব্যবহারের উপযোগী হবে না। কারন এটি সংস্কারের চেয়ে নতুন করে নির্মান করা প্রয়োজন। একারনে বরাদ্দ হওয়া ৫০ লাখ টাকা থেকে ৪০ লাখ টাকা জোহা হল সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত অবশিষ্ট ৭০ লাখ টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে মহসিন হল মেরামত ও বিদ্যুৎ লাইন ঠিক করা, ৩০ লাখ টাকা দিয়ে কমার্স ভবন এবং ১২ লাখ টাকা দিয়ে কলা ভবন মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহত্তর খুলনায় উচ্চশিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল ( বিএল) কলেজ। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিন- পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের হ্নদয়ের ও মননে দীর্ঘ দিন ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ৪১ একর জমির ওপর দাড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২৩টি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে ২১ টি বিভাগে অনার্স এবং ২২ টি বিভাগে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে।
শতবর্ষের ঐতিহ্য ধারন করা কলেজটিতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগলেও রয়েছে নানা সংকট। শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি আবাসিক হোস্টেল থাকলেও ছেলেদের পাঁচটি হোস্টেলই পরিত্যাক্ত। মেয়েদের দুটি হোস্টেল চালু রয়েছে এবং আরেকটি সংস্কারের শেষে চালুর অপেক্ষায়। ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা সীমিত হয়ে পড়েছে।
তবে পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও কলেজটির রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। বিএল কলেজ থিয়েটার, ডিবেটিং ক্লাব, আবৃত্তি সংগঠন " বায়ান্ন" সহ বিভিন্ন সংস্কৃতি সংগঠন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জীবনমুখী শিক্ষার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ক্লাব। কলেজের গ্রহ্নাগারে রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি বই। ভৈরব তীরে যাত্রা শুরু : খুলনা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দুরে দৌলতপুর ভৈরব নদের তীরে দুটি টিনসেড ঘর নিয়ে ১৯০২ সালের ২৭ জুলাই কলকাতার হিন্দু কলেজের আদলে প্রতিষ্ঠিত হয় বিএল কলেজ। শুরুতে এর নাম ছিল " হিন্দু একাডেমি "।
প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাটের বাউডাঙ্গার জমিদার এবং তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ব্রজলাল চক্রবর্তী ( শাস্ত্রী) । সংস্কৃতি, ইংরেজি সাহিত্য ও আইন বিষয়ে পন্ডিত এই বিদ্যানুরাগীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের আর্থিক সহায়তা ও সমর্থনে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০২ সালের ৩ জুলাই কলেজের দাপ্তরিক কাযক্রম শুরু হলেও পাঠদান শুরু হয় ২৭ জুলাই। শুরুতে সম্পুর্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানটি " চতুস্পাঠী" ও " একাডেমি" নামে দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল।
চতুস্পাঠীর শিক্ষার্থীদের খাবার, পড়াশোনা ও আবাসনের খরচ প্রতিষ্ঠান থেকেই বহন করা হতো। ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯১২ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানবীর হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের সৈয়দপুর এস্টেট থেকে ৪০ একর জমি কলেজকে দান করা হয়। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা ব্রজলালের মৃত্যুর পর কলেজটির নামকরন করা হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমি।
পরে একাডেমিকে কলেজে উন্নীত করা হয় এবং সংক্ষপে নাম হয় বিএল কলেজ। ১৯৬৭ সালের ১ লা জুলাই এটি সরকারি কলেজে পরিনত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৯ জন ছাত্র নিয়ে এফএ ( ফাস্ট আর্টস) শ্রেনীর পাঠদান শুরু হয়। আবাসিক কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ছিল অভিভক্ত বঙ্গদেশের প্রথম কলেজ গুলোর একটি। তখন অধ্যক্ষসহ শিক্ষক ছিলেন চারজন। প্রতিষ্ঠার প্রথম সাত বছর শুধু উচ্চবর্নের হিন্দু ছাত্ররা এখানে পড়ার সুযোগ পেতেন। শুরুতে মুসলিম ও নিন্ম বর্নের হিন্দুদের ভর্তির সুযোগ ছিল না।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই ৩৪ বছর : দক্ষিন- পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই বিদ্যাপীঠে ৪৩ বছর ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক শীর্ষ নেতা এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রয়াত অনেক নেতা এই কলেজ থেকে তাদের রাজনৈতিক জীবনের সুচনা করেছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ দিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গনতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন তারা। নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় একদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরার কার্যকর মাধ্যম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে।
এর পরের বছর, ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংসদের জিএস শিবির নেতা মুন্সি আব্দুল হালিম এবং সাহিত্য সম্পাদক শেখ রহমত আলীকে কলেজ ক্যাম্পাসে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এর জেরে পরে বিএল কলেজ ছাত্রদল নেতা আবুল কালাম আজাদকেও হত্যা করা হয়। ঔই দিনই বিএল কলেজ ছাত্র সংসদ বন্ধ এবং ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতি চালু হলেও ছাত্র সংসদ আর চালু হয়নি।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিএল কলেজ শাখার সিনিয়র সহ - সভাপতি হামিদুর রহমান শোভন বলেন, দক্ষিনবঙ্গের বৃহত্তম উচ্চ শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান সরকারি বিএল কলেজ। এখানে ছাত্র সংসদ আছে, কিন্তু সুদীর্ঘ বছর ধরে নির্বাচন হয়না। আমরা মনে করি এই মুহুর্তে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন। এতে নতুন নেতৃত্ব আসবে।
তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়ত রয়েছে, যা ছাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। ভবন কেন্দ্রিক সিসিটিভি থাকলেও মাঠ, সড়ক ও খোলা জায়গাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপন করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের হল গুলোও দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। কলেজের শিক্ষার্থী স্মৃতি রায় বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যে প্রতিনিধিরা উঠে আসেন, তারা কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন।
গনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিবছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। সাহিত্য - সংস্কৃতিতেও সরব ক্যাম্পাস : শুরু পড়াশুনা নয়, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিতেও সরব বিএল কলেজ ক্যাম্পাস। আবৃত্তি সংগঠন " বায়ান্ন" নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদিকে দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে " বিএল কলেজ জার্নাল"।
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় প্রকাশিত এই জার্নালে ভাষা ও সাহিত্য, শিল্প - সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কলেজের শিক্ষক গবেষকেরা লিখছেন। বছরে দুটি করে এখন পর্যন্ত জার্নালের ৮টি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে। গত মার্চে প্রকাশিত হয়েছে কলেজের বার্ষিকী " বিহঙ্গ'র শতবর্ষ সংখ্যা।
যশোর- খুলনার ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের লেখক অধ্যাপক সতীশচন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় ১৯২৩ সালে প্রথম " দেবায়তন " নামে কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ১৯২৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একশ বছরের লেখা থেকে বাছাই করে নির্বাচিত কলেজ ম্যাগাজিন ( ১৯২৩-২০২৩) প্রকাশিত হয়েছে গত জুনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের "ফ্রেভার দিতে ২৫০ কেটি টাকার পরিকল্পনা : কলেজটির বর্তমান অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশকে আরো আধুনিক করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি বিএল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রেভার দিতে একটি মাস্টারপ্লান করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে। অধ্যক্ষ বলেন, এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেভারে চলে আসবে। তিনি জানান, মাস্তারপ্লানে পাঠাগার জন্য পানি শোধনাগার নির্মান, আধুনিক বিজ্ঞান ভবন, মাল্টিপারপাস ১০তলা ভবন,পরিবহন সুবিধা বাড়ানো, হোস্টেল সংস্কার ও নতুন আবাসন ব্যবস্থা, শিক্ষক - কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য যানবাহন, প্রশাসনিক কাজের জন্য গাড়ি, মসজিদ কমপ্লেক্স, পুকুর ও মাঠ সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে পরিবহনের জন্য ৬টি বাস থেকে সংখ্যা বাড়িয়ে ২০ টি বাসে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাচটি হোস্টেলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করার কথাও ভাবা হচ্ছে। ১৯১ জন শিক্ষকের যাতায়াতের জন্য ৩৬ আসনের একটি এসি কোস্টার এবং প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, গত বছরের নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখতে পান কলেজের পাঁচটি ছেলেদের হলের মধ্যে তিনটি পরিত্যাক্ত এবং দুটি সংস্কার প্রয়োজন। তিনি জানান,তিতুমীর হল সংস্কারের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুমোদন হয়েছে।
এর মধ্যে কাজ শুরুর জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয় এবং টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। তবে তার মতে, সংস্কার হলেও তিতুমীর হল পুরোপুরি ব্যবহারের উপযোগী হবে না। কারন এটি সংস্কারের চেয়ে নতুন করে নির্মান করা প্রয়োজন। একারনে বরাদ্দ হওয়া ৫০ লাখ টাকা থেকে ৪০ লাখ টাকা জোহা হল সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত অবশিষ্ট ৭০ লাখ টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে মহসিন হল মেরামত ও বিদ্যুৎ লাইন ঠিক করা, ৩০ লাখ টাকা দিয়ে কমার্স ভবন এবং ১২ লাখ টাকা দিয়ে কলা ভবন মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
