স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক শারীরিক ভঙ্গি মেনে চললে মেরুদণ্ডের অনেক সমস্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এসব অভ্যাসের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট সমস্যায় ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল ও উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
বিশ্ব স্পাইন দিবস উপলক্ষে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের আয়োজনে সমাবেশ ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
জীবনযাপনে পরিবর্তনেই মিলতে পারে সুফল
দিবসটি উপলক্ষে সকালে র্যালির আয়োজন করা হয়। পরে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স গ্যালারিতে বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান।
তিনি বলেন, মেরুদণ্ড মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে এর সুস্থতা নিবিড়ভাবে জড়িত। সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাঁর মতে, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অভ্যাসের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য আক্রমণাত্মক চিকিৎসার প্রয়োজনও কমানো যেতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান
ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আ. ফ. ম. মোমতাজ হক বলেন, একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি জানান, মেরুদণ্ডের আধুনিক অস্ত্রোপচার চালু করতে গিয়ে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সি-আর্ম যন্ত্র, উপযুক্ত অস্ত্রোপচার টেবিল ও আধুনিক সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সুবিধা সব সময় পাওয়া যায় না।
তাঁর মতে, এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা চিকিৎসকেরা যেন দেশে তাঁদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বাড়াচ্ছে কোমরব্যথার ঝুঁকি
নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আশিক এহসান বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মেরুদণ্ডের সমস্যা ও কোমরব্যথার ঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, রাত জাগা ও মানসিক চাপ মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, প্রচলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় চারজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কোমরব্যথায় ভুগতে পারেন।
কোমরব্যথার ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার এবং দৈনন্দিন কাজে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
বসা, দাঁড়ানো ও ভার তোলার সঠিক নিয়ম
নিউরোসার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. ইমাম হোসেন খান বলেন, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে মেরুদণ্ডের আঘাতসহ বিভিন্ন সমস্যার প্রকোপ কমানো সম্ভব।
বিভাগটির সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা ইশরাত জাহান (রিফাত) দৈনন্দিন কাজে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘক্ষণ সামনের দিকে ঝুঁকে বা কুঁজো হয়ে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভুল ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে কোনো বস্তু তুললে আন্তঃকশেরুকা চাকতির (ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক) ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
কোমরব্যথা এড়াতে যা করবেন
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করা জরুরি:
- নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম করুন।
- শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং সুষম খাবার খান।
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে বিরতি নিন ও অবস্থান পরিবর্তন করুন।
- বসা ও দাঁড়ানোর সময় স্বাভাবিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
- মেঝে থেকে কিছু তোলার সময় কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে না পড়ে হাঁটু ভাঁজ করুন এবং পিঠ যথাসম্ভব সোজা রাখুন।
- ভারী বস্তু তোলার সময় সেটি শরীরের কাছাকাছি রাখুন এবং কোমরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও সচেতনতার সমন্বয় মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং কোমরব্যথার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক শারীরিক ভঙ্গি মেনে চললে মেরুদণ্ডের অনেক সমস্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এসব অভ্যাসের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট সমস্যায় ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল ও উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
বিশ্ব স্পাইন দিবস উপলক্ষে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের আয়োজনে সমাবেশ ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
জীবনযাপনে পরিবর্তনেই মিলতে পারে সুফল
দিবসটি উপলক্ষে সকালে র্যালির আয়োজন করা হয়। পরে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স গ্যালারিতে বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান।
তিনি বলেন, মেরুদণ্ড মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে এর সুস্থতা নিবিড়ভাবে জড়িত। সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাঁর মতে, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অভ্যাসের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য আক্রমণাত্মক চিকিৎসার প্রয়োজনও কমানো যেতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান
ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আ. ফ. ম. মোমতাজ হক বলেন, একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি জানান, মেরুদণ্ডের আধুনিক অস্ত্রোপচার চালু করতে গিয়ে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সি-আর্ম যন্ত্র, উপযুক্ত অস্ত্রোপচার টেবিল ও আধুনিক সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সুবিধা সব সময় পাওয়া যায় না।
তাঁর মতে, এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা চিকিৎসকেরা যেন দেশে তাঁদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বাড়াচ্ছে কোমরব্যথার ঝুঁকি
নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আশিক এহসান বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মেরুদণ্ডের সমস্যা ও কোমরব্যথার ঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, রাত জাগা ও মানসিক চাপ মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, প্রচলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় চারজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কোমরব্যথায় ভুগতে পারেন।
কোমরব্যথার ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার এবং দৈনন্দিন কাজে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
বসা, দাঁড়ানো ও ভার তোলার সঠিক নিয়ম
নিউরোসার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. ইমাম হোসেন খান বলেন, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে মেরুদণ্ডের আঘাতসহ বিভিন্ন সমস্যার প্রকোপ কমানো সম্ভব।
বিভাগটির সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা ইশরাত জাহান (রিফাত) দৈনন্দিন কাজে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘক্ষণ সামনের দিকে ঝুঁকে বা কুঁজো হয়ে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভুল ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে কোনো বস্তু তুললে আন্তঃকশেরুকা চাকতির (ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক) ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
কোমরব্যথা এড়াতে যা করবেন
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করা জরুরি:
- নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম করুন।
- শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং সুষম খাবার খান।
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে বিরতি নিন ও অবস্থান পরিবর্তন করুন।
- বসা ও দাঁড়ানোর সময় স্বাভাবিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
- মেঝে থেকে কিছু তোলার সময় কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে না পড়ে হাঁটু ভাঁজ করুন এবং পিঠ যথাসম্ভব সোজা রাখুন।
- ভারী বস্তু তোলার সময় সেটি শরীরের কাছাকাছি রাখুন এবং কোমরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও সচেতনতার সমন্বয় মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং কোমরব্যথার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
