বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
চেকপোস্ট

ইসলামী ব্যাংক সংকট: টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহক, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

ব্যাংকে জমা রাখা নিজের কষ্টার্জিত অর্থ তুলতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজারো গ্রাহক। বিশেষ করে সংকটে থাকা শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকদের অভিযোগ এখন প্রায় একই-টাকা তুলতে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একেক সময় একেক অজুহাত দিচ্ছে।চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে তার তিন কোটির বেশি টাকা আটকে আছে। গত দেড় বছরে তিনি তুলতে পেরেছেন মাত্র সাত লাখ টাকা।তার ভাষ্য, বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি। তার মতো অনেক গ্রাহকই এখন হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।এই সংকটের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকেরা বিক্ষোভ করেছেন। কোথাও কোথাও ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এসব ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এই উদ্যোগে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নতুন বিনিয়োগের অভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, একীভূতকরণ সাধারণত স্বেচ্ছায় হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে তা হয়নি, বরং একাধিক দুর্বল ব্যাংককে জোর করে একত্র করা হয়েছে।অন্যদিকে, বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব মনে করেন, উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।এর মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’। এই আইনের কিছু ধারা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অতীতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কিছু মালিক আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে পারেন।যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী শর্ত পূরণ ছাড়া কাউকে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে না।এদিকে, একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে আবার স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হওয়ার আবেদন করেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, এটি পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সময় এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত।তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে এসব ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে নতুন ব্যাংক কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।তবে এখন পর্যন্ত পুঁজি সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারার দায় শুধু গ্রাহকদের ওপর চাপানো যায় না; রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও এর দায় নিতে হবে।সূত্র: বিবিসি বাংলা

ইসলামী ব্যাংক সংকট: টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহক, বাড়ছে অনিশ্চয়তা