শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

তামা নাকি পিতল কোন বাসনে খাবার বেশি নিরাপদ?

একসময় বাঙালি বাড়িতে তামা ও পিতলের বাসনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বর্তমানে স্টিল, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম ও ননস্টিকের মতো আধুনিক বাসনের কারণে সেই ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। তবে ঐতিহ্যবাহী বাসনের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় অনেকের রান্নাঘরে আবারও জায়গা করে নিচ্ছে তামা ও পিতলের থালা, বাটি, গ্লাস ও হাঁড়ি।এসব বাসন নিয়ে নানা স্বাস্থ্য উপকারের কথা প্রচলিত থাকলেও শুধু ধাতুর নামের ওপর ভিত্তি করে কোনো বাসনকে নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায় না। বাসনের গঠন, ভেতরের আবরণ, খাবারের ধরন এবং ব্যবহারের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।পিতল মূলত তামা ও জিঙ্কের সংকর ধাতু। শরীরের জন্য তামা ও জিঙ্ক দুটিই প্রয়োজনীয় খনিজ। তবে পিতলের বাসনে রান্না বা খাবার খেলেই শরীরের প্রয়োজনীয় এসব খনিজের চাহিদা পূরণ হবে এমন দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।এ ছাড়া সব পিতলের বাসন একই উপাদানে তৈরি নয়। কিছু পণ্যে অন্যান্য ধাতুও থাকতে পারে। বিশেষ করে নিম্নমানের বা অজানা উৎসের পিতলের বাসনে সীসার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্য তৈরি মানসম্মত বাসন বেছে নেওয়া জরুরি।তামা খুব ভালো তাপ পরিবাহী। ফলে তামার পাত্রে রান্নার সময় তাপ দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তামা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজও।তবে অতিরিক্ত তামা শরীরে প্রবেশ করলে বমি বমি ভাব, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সংস্পর্শে থাকলে আরও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।তাই তামার বাসন ব্যবহার করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়। বরং খাবারের সঙ্গে সরাসরি তামার সংস্পর্শ হচ্ছে কি না এবং বাসনটির অবস্থা কেমন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।টমেটো, ভিনেগার, তেঁতুলসহ অ্যাসিডিক খাবারের সঙ্গে তামার সরাসরি সংস্পর্শ হলে খাবারে তামা মিশে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।এ কারণে অনেক তামার রান্নার পাত্রের ভেতরে অন্য ধাতুর আবরণ দেওয়া থাকে। এই আবরণ খাবার ও তামার সরাসরি সংস্পর্শ কমাতে সাহায্য করে। তবে আবরণ উঠে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই পাত্র ব্যবহার না করাই নিরাপদ।তামার পাত্রে পানি রেখে পান করার প্রচলন অনেক পুরোনো। এ নিয়ে নানা স্বাস্থ্য উপকারের দাবি থাকলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তামার পাত্রে রাখা পানি রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার বিশেষ উপায়—এমন প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ নেই।তামার পাত্রে দীর্ঘ সময় পানি রাখলে তাতে কিছু তামা মিশে যেতে পারে। পাত্র পুরোনো, ক্ষয়প্রাপ্ত বা অনুপযুক্ত হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।পিতলের বাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সীসার উপস্থিতির সম্ভাবনা। বিভিন্ন দেশে পরীক্ষায় কিছু ঐতিহ্যবাহী ও আমদানি করা ধাতব বাসনে সীসা পাওয়া গেছে। এসব বাসন খাবারের সংস্পর্শে এলে সীসা খাবারে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।তবে এর অর্থ সব পিতলের বাসনেই সীসা রয়েছে—এমন নয়। বাসনের মান, প্রস্তুতকারক এবং খাবারের সংস্পর্শে ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই করাই গুরুত্বপূর্ণ।তামা ও পিতলের মধ্যে একটিকে সব পরিস্থিতিতে বেশি নিরাপদ বলা ঠিক নয়। তামার ক্ষেত্রে আবরণ অক্ষত থাকা এবং অ্যাসিডিক খাবারের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে পিতলের ক্ষেত্রে বাসনের উপাদান ও সম্ভাব্য সীসা দূষণের বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।অর্থাৎ বাসনটি কোন ধাতুর তৈরি তার চেয়ে সেটি মানসম্মত কি না, খাবারের জন্য উপযোগী কি না এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।খাবারের জন্য তৈরি ও মানসম্মত বাসন কিনুন। তামার বাসনের ভেতরের আবরণ উঠে গেলে ব্যবহার বন্ধ করুন। আবরণহীন তামার পাত্রে টক বা অ্যাসিডিক খাবার রান্না ও সংরক্ষণ এড়িয়ে চলুন। অজানা উৎসের পুরোনো পিতলের বাসনে খাবার রান্না বা সংরক্ষণ না করাই ভালো। বাসন পরিষ্কারে অতিরিক্ত ঘষাঘষি করবেন না, এতে আবরণ নষ্ট হতে পারে। তামা বা পিতলের পাত্রে খাবার দীর্ঘ সময় রেখে দেওয়ার আগে সেটি খাবার সংরক্ষণের উপযোগী কি না নিশ্চিত করুন। সবশেষে, তামা বা পিতলের বাসন ব্যবহার মানেই স্বাস্থ্যঝুঁকি—এমনটি যেমন ঠিক নয়, তেমনি ঐতিহ্যবাহী বলেই এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর—এমন দাবিও করা যায় না। মানসম্মত, খাবার-উপযোগী এবং অক্ষত বাসন ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তামা নাকি পিতল কোন বাসনে খাবার বেশি নিরাপদ?