বন্দুক-তলোয়ার থেকে রাজা-রানীর পোশাক, সিনেমার কাশেম এখন একা
কারওয়ান বাজারের ডিআইটি মার্কেটের দ্বিতীয় তলার ছোট্ট একটি দোকান। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই যেন চোখে পড়ে বাংলা চলচ্চিত্রের হারিয়ে যেতে বসা এক সময়ের স্মৃতি। রাজা-রানী, সেনাপতি, পুলিশ, জল্লাদসহ নানা চরিত্রের পোশাক, বন্দুক-তলোয়ার ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন মোহাম্মদ আবুল কাশেম।১৯৭২ সাল থেকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত তিনি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সিনেমার প্রয়োজনীয় পোশাক ও সরঞ্জাম ভাড়া দিয়ে আসছেন। তার সরবরাহ করা পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে পর্দায় হাজির হয়েছেন ববিতা, শাবানা, বাপ্পারাজসহ বাংলা চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় শিল্পী।একসময় তার দোকানে কাজের চাপ ছিল প্রচণ্ড। নির্মাতা, শিল্পী ও চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আনাগোনায় ব্যস্ত থাকত দোকানটি। কাশেমের সঙ্গে কাজ করতেন ১৮ জন সহযোগী।সেই সময়ের কথা মনে করে আবুল কাশেম বলেন, আগে ইন্টারভিউ দেওয়ারও সময় পেতেন না। কাজের ব্যস্ততায় দিন-রাত কেটে যেত। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। দিনে এক-দুজন ক্রেতা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের গল্প, নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তি। কমেছে পোশাকনির্ভর এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের কাজ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাশেমের পেশায়। কমেছে কাজ, আয় ও ব্যস্ততা।তবু পুরোনো পেশা ছাড়েননি তিনি। আবুল কাশেমের ভাষায়, এই কাজ শুধু তার জীবিকা নয়; জীবনের সঙ্গে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জড়িয়ে থাকা একটি সম্পর্ক। এত বছর ধরে কাজ করার পর চাইলেও সহজে তা ছেড়ে যেতে পারছেন না।তার দোকানের পোশাক ও সরঞ্জামগুলো এখন শুধু ব্যবসার সামগ্রী নয়, বরং দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিও। কোনো পোশাক হয়তো ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রিয় কোনো শিল্পীর চরিত্রে, কোনো তলোয়ার হয়তো ছিল যুদ্ধের দৃশ্যে। প্রতিটি সরঞ্জামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের নেপথ্যের কোনো না কোনো গল্প।প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে কাশেমের মতো নেপথ্যের কারিগরদের কাজও সংকুচিত হয়ে আসছে। তার চোখের সামনে হারিয়ে যেতে বসেছে একটি পুরোনো পেশা। তাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা করেন তিনি।কাজ কমে গেলেও প্রতিদিন দোকানের সাটার তোলেন আবুল কাশেম। আগের মতো পরিচালক-শিল্পীদের ভিড় নেই, নেই ১৮ সহযোগীর ব্যস্ততা। তবুও অপেক্ষা করেন নতুন কাজের।কারণ তার কাছে সিনেমা শুধু একটি পেশা নয়—এটি জীবনের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সঙ্গী। ক্যামেরার সামনে কখনো দেখা না গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রের অসংখ্য চরিত্রের পোশাক ও সরঞ্জামের আড়ালে মিশে আছে তার শ্রম। কারওয়ান বাজারের ছোট্ট দোকানটি তাই হয়ে উঠেছে বাংলা চলচ্চিত্রের বদলে যাওয়া সময়ের এক নীরব স্মৃতিঘর।