সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

যে ভিলেনকে সত্যিই ভয় পেত দর্শক, তিনি সাদেক বাচ্চু

একজন অভিনেতার অভিনয় কতটা জীবন্ত হলে দর্শক পর্দার চরিত্রকেই বাস্তব মানুষ ভেবে বসেন? সাদেক বাচ্চুর অভিনয়জীবনের একটি ঘটনা যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর।এক টেলিভিশন ধারাবাহিকে রাজাকারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। নাটকের একটি দৃশ্যে তাঁর চরিত্র একজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিন বোনকে আনতে ট্রেনে জামালপুর যাওয়ার সময় স্টেশনে দর্শকদের ক্ষোভের মুখে পড়েন সাদেক বাচ্চু। কেউ ছুড়ে দেন বাদামের খোসা, কেউ পাথর। চরিত্র আর অভিনেতাকে এক করে ফেলেছিলেন দর্শক।ঘটনাটি মজার স্মৃতি হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার বড় স্বীকৃতি। চরিত্রকে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন যে দর্শক কিছু সময়ের জন্য ভুলেই গিয়েছিলেন—পর্দার মানুষটি বাস্তবের সাদেক বাচ্চু নন।আজ ১৪ সেপ্টেম্বর, তাঁর ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবস। ২০২০ সালের এই দিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান এই জনপ্রিয় অভিনেতা।মাহবুব থেকে সাদেক বাচ্চু১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে জন্ম নেওয়া সাদেক বাচ্চুর আসল নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক। চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম ‘চাঁদনী’ ছবিতে অভিনয়ের সময় তাঁর নাম দেন ‘সাদেক বাচ্চু’। পরে এই নামেই পরিচিতি পান তিনি।বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে চাকরিতে যোগ দেন। বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং টি অ্যান্ড টি নাইট কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন।বেতার থেকে রুপালি পর্দায়সাদেক বাচ্চুর অভিনয়জীবন শুরু হয় বেতারে। মাত্র আট বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘খেলাঘর’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে পা রাখেন। পরে মঞ্চে সক্রিয় হন এবং গণনাট্য পরিষদসহ বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করেন।১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মতিঝিল থিয়েটার’। অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যরচনা ও নির্দেশনাতেও যুক্ত ছিলেন তিনি।১৯৭৪ সালে ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে অভিষেকের পর অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর টেলিভিশন নাটকের সংখ্যা এক হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।নায়ক থেকে জনপ্রিয় খলনায়ক১৯৮৫ সালে শহীদুল আমিনের ‘রামের সুমতি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সাদেক বাচ্চুর। শুরুতে নায়ক ও ইতিবাচক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন।তবে এহতেশামের ‘চাঁদনী’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন তিনি।তাঁর চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন ও শরীরী ভাষা খলচরিত্রগুলোকে করে তুলত আরও জীবন্ত। ফলে ‘ভিলেন’ পরিচয়টিই হয়ে ওঠে তাঁর অভিনয় ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরিচিতি।পাঁচ শতাধিক ছবির অভিনয়দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সাদেক বাচ্চু। ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘লাভ ম্যারেজ’, ‘রাজাবাবু-দ্য পাওয়ার’, ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি ২’সহ বহু জনপ্রিয় সিনেমায় দেখা গেছে তাঁকে।শুধু খল চরিত্র নয়, ইতিবাচক, পার্শ্ব ও কৌতুকধর্মী চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি।শেষদিকে মিলেছে বড় স্বীকৃতি২০১৫ সালে ‘লাভ ম্যারেজ’ সিনেমার জন্য বাচসাস পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান। ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ খল অভিনেতা হন।দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শেষদিকে পাওয়া এই পুরস্কার যেন তাঁর ক্যারিয়ারের বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি হয়ে আসে।চলে গিয়েও পর্দায় অমলিন২০২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সাদেক বাচ্চু। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয় তাঁকে। ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।সাদেক বাচ্চু নেই ছয় বছর। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো এখনো বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।একজন অভিনেতার জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য হয়তো আর কিছু নেই—দর্শক তাঁকে দেখে ভয় পেয়েছিল, রাগ করেছিল, কখনো ঘৃণাও করেছিল; কারণ তিনি তাঁর চরিত্রকে সত্যি করে তুলতে পেরেছিলেন।

যে ভিলেনকে সত্যিই ভয় পেত দর্শক, তিনি সাদেক বাচ্চু