শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

দিরাইয়ে শতবর্ষী ‘বুড়া ঠাকুর’, গাছ ঘিরে লোককথা ও মেলা

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের সিংহনাদ গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির এক প্রাচীন বৃক্ষ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বুড়া ঠাকুর’ কিংবা ‘পাঁচগাছি’ নামে পরিচিত।শত বছরের পুরোনো এই বৃক্ষকে ঘিরে রয়েছে ধর্মীয় আচার, পূজা, মানত, মেলা ও নানা লোককথা। এসব বিশ্বাস ও কিংবদন্তির কারণে গাছটি স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন কেদার জমিজুড়ে বিস্তৃত এই বৃক্ষের সঠিক বয়স কেউ জানেন না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির বিশাল শিকড় ও বিস্তৃত ডালপালা এর দীর্ঘ অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। আশপাশে রয়েছে অসংখ্য হিজলগাছ।বৃক্ষটির মূল শিকড়ের পাশে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। সেখানে নিয়মিত ভক্তরা পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও মানত করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিরাই-সুনামগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে মানত ও পূজা দিতে আসেন।স্থানীয় বাসিন্দা রাবেন্দ্র তালুকদার বলেন, বুড়া ঠাকুরকে ঘিরে এলাকার মানুষের বিশ্বাস অনেক পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, দূর-দূরান্তের মানুষ এখানে এসে মানত করেন। মানত পূরণ হলে আবার পূজা দিতে আসেন।পাঁচ না ছয়, পাথর নিয়েও রহস্যবৃক্ষটির আশপাশে থাকা কয়েকটি পাথর নিয়েও রয়েছে নানা কৌতূহল। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, কখনো সেখানে পাঁচটি আবার কখনো ছয়টি পাথর দেখা যায়। তবে এসব পাথরের উৎস বা সংখ্যার পরিবর্তনের কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।স্থানীয় লিলু বিশ্বাস জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এসব কথা শুনে আসছেন। তবে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।বিলের সিন্দুকের গল্প‘বুড়া ঠাকুর’ গাছের পেছনে থাকা বড় বিলকে ঘিরেও প্রচলিত রয়েছে নানা লোককথা।গ্রামের প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় ওই বিলের পানিতে নাকি সিন্দুক ভেসে উঠত। কথিত আছে, এসব সিন্দুকের মধ্যে ছিল সোনার তৈরি বিভিন্ন পূজার সামগ্রী।গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল দাস রায় বলেন, গাছটির বয়স যেমন নিশ্চিতভাবে জানা নেই, তেমনি বিলের সিন্দুকের গল্পও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা।এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে, পূজার সময় প্রয়োজনীয় বাসন না থাকলে উলুধ্বনি দিলে পানিতে তা ভেসে উঠত। তবে এসব ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।স্থানীয়দের এসব দাবি নিয়ে কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই সিন্দুক, সোনার পূজাসামগ্রী বা পানিতে বাসন ভেসে ওঠার ঘটনাগুলোকে লোককথা ও স্থানীয় কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা হয়।চৈত্রের প্রথম রবিবার বসে মেলা‘বুড়া ঠাকুর’কে ঘিরে রয়েছে নিয়মিত ধর্মীয় আয়োজন। প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রথম রবিবার এখানে মহাদেবের পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে বসে বড় মেলা।স্থানীয় বেণু মাধব তালুকদার জানান, মেলা উপলক্ষে গাছটির সামনের বিশাল মাঠজুড়ে বিভিন্ন ধরনের দোকান বসে। শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।তিনি বলেন, মেলার অন্যতম আয়োজন হলো পাঠা বলি। মানত পূরণের অংশ হিসেবে অনেক ভক্ত পাঠা নিয়ে আসেন।নিয়মিত ভক্ত জিবেশ বৈদ্য বলেন, চৈত্র মাসের প্রথম রবিবারের মেলা শুধু পূজা নয়, এটি মানুষের মিলনমেলাও। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত ও আত্মীয়স্বজনরা এখানে আসেন।শতবর্ষী এই বৃক্ষের প্রকৃত বয়স, পাথরের সংখ্যা পরিবর্তন কিংবা বিলের সিন্দুকের গল্পের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও লোককথার সঙ্গে মিশে ‘বুড়া ঠাকুর’ আজ সিংহনাদ গ্রামের একটি ঐতিহ্য ও কৌতূহলের স্থান হিসেবে টিকে আছে।

দিরাইয়ে শতবর্ষী ‘বুড়া ঠাকুর’, গাছ ঘিরে লোককথা ও মেলা