দিরাইয়ে সংঘর্ষের পর প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে পর্যায়ক্রমে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এতে সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার বসতভিটা ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ও বিভিন্ন স্থানে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাসজমি, জলমহাল ও গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম।গত ১২ মে দুই পক্ষের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত শাহাদ্বীব আলীর পক্ষের রতন মিয়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মে সকালে মারা যান। এ ঘটনায় রতন মিয়ার বাবা মো. সোনা মিয়া বাদী হয়ে ১৬৯ জনের বিরুদ্ধে দিরাই থানায় হত্যা মামলা করেন।অর্ধশতাধিক ঘর ভাঙচুরের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার এড়াতে রফিকুল ইসলামের পক্ষের পুরুষ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেলে গ্রামে একতরফা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর শাহাদ্বীব আলীর লোকজন পর্যায়ক্রমে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।তাদের দাবি, অর্ধশতাধিক ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। গবাদিপশু, ধান, আসবাবপত্র, নৌকা, মাড়াই মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ করেছেন তারা।সম্প্রতি সরেজমিনে আলীনগর গ্রামে গিয়ে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেছে। সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য রেনুকা বেগমের পাকা বাড়ির ছাদে ড্রিল দিয়ে বড় বড় ছিদ্র করা হয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে দেয়াল ভেঙে দরজা-জানালা খুলে নেওয়ার চিহ্নও রয়েছে। ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে লেপ-তোষকসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ। রেনুকা বেগমের দাবি, তাঁর দেবর জামাল মিয়ার আধাপাকা ঘরটিও সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, “সারা জীবনের সঞ্চয় লুটে নেওয়া হয়েছে। মাথা গোঁজার ঘরটিও ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে বাড়িতে ফিরতে পারছি না।” বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাঁর দেবর জামাল মিয়া পরিবার নিয়ে সিলেটে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক টিনসেড ঘরের চালে অসংখ্য ফুটো। কোনো কোনো ঘরের বেড়া নেই। ভাঙা ঘরের ভেতরে নেই আসবাবপত্র। হামলা থেকে টিউবওয়েল ও শৌচাগারও রক্ষা পায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।টাকা নেওয়ার অভিযোগ গ্রামের সুবেনা বেগম, রাজনা বেগম, হেপী বেগম, রামনা বেগম, আমিনা, রুশনা, দুলিয়া, সিদ্দিকা ও রেহেনা বেগমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ঘরের জিনিসপত্র, গরু-ছাগল, ধান, নৌকা ও মাড়াই মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার পর বসতঘর ভাঙচুর করা হয়েছে।তাদের আরও অভিযোগ, বাড়িঘর ভাঙচুর না করার কথা বলে কোনো কোনো পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। রামনা বেগমের কাছ থেকে ৬০ হাজার, জাহানারা বেগমের কাছ থেকে ৫০ হাজার, সলখ নূরের কাছ থেকে ৪০ হাজার, রাজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং রুসেদের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।রামনা বেগম বলেন, বাড়িঘর ভাঙবে না বলে ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব আলী আমার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও তাঁর পক্ষের লোকজন আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে।অভিযোগ অস্বীকার শাহাদ্বীবের অভিযোগের বিষয়ে শাহাদ্বীব আলী বলেন, একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। উত্তেজনার বশে কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর হতে পারে। তবে লুটপাটের অভিযোগ সঠিক নয়।তিনি দাবি করেন, সংঘর্ষের পর প্রায় দুই সপ্তাহ গ্রামে পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রতিপক্ষের লোকজন নিজেদের মালপত্র সরিয়ে নিয়েছেন।রফিকুল ইসলামের পক্ষের কয়েকজন জানান, হত্যা মামলার তিন আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং পাঁচজন পলাতক। অন্যরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। তারা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।বৃদ্ধ মশকুর আলী বলেন, কয়েকদিন আগে বাড়িতে ফিরেছিলেন। আলীনগর বাজারে সদাই করতে গেলে শাহাদ্বীবের লোকজন তাঁকে মারধর করে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।পুলিশের বক্তব্য দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, দিরাই থানায় যোগদানের পর ঘটনাটি জানতে পেরে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই সময় হত্যা মামলার আসামিরা পলাতক ছিলেন। তাঁদের ঘর, দরজা ও বেড়া ভাঙা এবং ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় দেখা গেছে।ওসি আরও জানান, পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে ক্ষয়ক্ষতি এবং সংঘর্ষের সময় তাঁদের পক্ষের লোকজন আহত হওয়ার ঘটনায় আদালতে একটি মামলা করেছেন। মামলাটি এখনো থানায় আসেনি। থানায় এলে যথাযথ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।