বাঁশশিল্পের পুনরুজ্জীবনে ও মাহালী সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক উত্তরণে কাজ করছে 'মাক্কানী
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বাঁশশিল্প একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তবে কালের বিবর্তনে প্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, বাজারসংকট এবং কারুশিল্পীদের পেশা পরিবর্তনের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশীয় বাঁশশিল্পের পুনরুজ্জীবন, পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রসার এবং স্থানীয় কারুশিল্পীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) একদল শিক্ষার্থী। তরুণ এই স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছে সামাজিক উদ্যোগ ‘মাক্কানী’। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে কাজ করছেন হাবিপ্রবির শিক্ষার্থী— মোহাম্মদ ফাইজ, সামসুন্নাহার মুমু, নাফিসা তাবাচ্ছুম, রিফাহ তুস সাবা রাহী, রেজাউল হক এবং জাবির মুর্তাজা মাদানী।‘মাক্কানী’র মূল দর্শন হলো— "একজন বাঁশমাহালী এগিয়ে গেলে এগিয়ে যায় একটি পরিবার, একটি ঐতিহ্য।" এই ভাবনাকে সামনে রেখে বাঁশমাহালী সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে তরুণদের এই সংগঠনটি।মাত্র ২,৪০০ টাকার এককালীন প্রাথমিক বিনিয়োগে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টের মাধ্যমে বর্তমানে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন হস্তশিল্প ও দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রতিটি পণ্য তৈরি হচ্ছে সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়া স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় ‘বাঁশমাহালী’দের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায়। এর ফলে একদিকে যেমন তারা ন্যায্য আয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠছে।নিজেদের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘মাক্কানী’ মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত নতুন পণ্য সংযোজন, গ্রাহকদের মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতে পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে যাচ্ছে তারা। আধুনিক বাজারব্যবস্থার সঙ্গে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে সংযুক্ত করার এই কার্যকর প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই সর্বমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা এবং সমাজের প্রান্তিক বাঁশমাহালী সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এই লড়াইয়ে ‘মাক্কানী’ একটি উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।