বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
চেকপোস্ট

গঙ্গাচড়ায় যে নীল ছিল অভিশাপ, আজ সেই নীলেই কৃষকের স্বপ্ন

একসময় ‘নীল’ শব্দটি বাংলার কৃষকের মনে জাগাত ভয়, শোষণ আর বিদ্রোহের স্মৃতি। ব্রিটিশ নীলকরদের জোরপূর্বক নীল চাষের বিরুদ্ধে ১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ ছিল কৃষকের প্রতিবাদের অন্যতম বড় অধ্যায়। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই নীলই এখন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষকের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের উৎস, পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রতীক এবং রপ্তানি সম্ভাবনাময় একটি ফসল।আলু তোলার পর কিংবা আমন রোপণের আগ পর্যন্ত যে জমিগুলো দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেসব জমিতেই চাষ হচ্ছে নীলগাছ। ইতিহাসের নেতিবাচক অধ্যায় পেরিয়ে কৃষক ও উদ্যোক্তার উদ্যোগে গঙ্গাচড়ার মাঠে নীল ফিরে এসেছে নতুন পরিচয়ে।গঙ্গাচড়ায় নীল চাষের নতুন যাত্রারংপুরের উদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় ২০০৫ সালে গঙ্গাচড়া এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে নীল চাষ শুরু করেন। পরে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও কৃষকদের সম্পৃক্ত করে তিনি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেড নীলপাতা প্রক্রিয়াজাত করে প্রাকৃতিক রঙ উৎপাদন করছে।গঙ্গাচড়ার বড়বিল, বেতগাড়ী ও খলেয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন নীল চাষ হচ্ছে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি বীজ বপনের পর ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি গাছ থেকে তিন দফায় পাতা সংগ্রহের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছ রেখে বীজও সংগ্রহ করা হয়।কম খরচে বাড়তি লাভকৃষকদের মতে, নীল চাষে খরচ কম, পরিচর্যাও তুলনামূলক সহজ। বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন প্রায় এক যুগ ধরে নীল চাষ করছেন। এবার তিনি ৫৯ শতক জমিতে নীল আবাদ করেছেন।তিনি বলেন, আগে আলু ও তামাক ওঠার পর জমি কয়েক মাস খালি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিতে নীল চাষ করে বাড়তি আয় হচ্ছে। একই সঙ্গে জমির উর্বরতাও বাড়ছে।কৃষক তরিকুল ইসলাম জানান, ২০ থেকে ২৫ শতক জমিতে নীল চাষে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। তিন দফায় পাতা বিক্রি করে আয় হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে লাভ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায়ও পৌঁছায়।পরিবেশবান্ধব ফসল হিসেবে নীলকৃষকদের দাবি, নীলগাছের ডালপালা ও অবশিষ্ট অংশ উৎকৃষ্ট জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে আসে। গঙ্গাচড়া ও আশপাশের কৃষকেরা উৎপাদিত সবুজ নীলপাতা স্থানীয় কারখানায় প্রতি কেজি ৪ থেকে ৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন।রংপুর সদর উপজেলার হরকলি এলাকায় অবস্থিত ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেডে আধুনিক প্রযুক্তিতে এসব পাতা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে প্রাকৃতিক ইন্ডিগো। প্রায় ৩০০ কেজি সবুজ পাতা থেকে উৎপাদন করা যায় ১ কেজি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো।রপ্তানি বাজারে বড় সম্ভাবনাউদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, রংপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া নীল চাষের জন্য উপযোগী। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ দেওয়া হচ্ছে এবং উৎপাদিত পাতা সরাসরি কিনে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে শত শত কৃষক এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।তিনি জানান, বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক ইন্ডিগোর চাহিদা বাড়ছে। সরকারি সহায়তা, গবেষণা, সহজ ঋণ ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে রংপুর অঞ্চল থেকেই বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।বাড়ছে নীল চাষের পরিধিরংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ উপজেলার ২০টি গ্রাম এবং নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় শত শত কৃষক নীল চাষ করেছেন।কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত প্রাকৃতিক নীল আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।একসময় যে নীল ছিল কৃষকের চোখের জলের কারণ, আজ সেই নীলই হয়ে উঠছে রংপুরের কৃষকের নতুন স্বপ্নের রঙ।

গঙ্গাচড়ায় যে নীল ছিল অভিশাপ, আজ সেই নীলেই কৃষকের স্বপ্ন