শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

খুলনায় ডেঙ্গু রোগীদের নিয়ে রমরমা প্যাথলজি বানিজ্য, টেস্টের নামে চরম হয়রানি ও অর্থ লুটের অভিযোগ

খুলনা অঞ্চল জুড়ে ভয়াবহ রুপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালে  প্রতিদিন উপচে পড়ছে আক্রান্ত রোগীর ভিড়। তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে খুলনায় গড়ে উঠেছে একশ্রেনীর অসাধু প্যাথলজি, মালিক, দালাল চক্র ও চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে পরিক্ষা- নিরিক্ষার নামে চরম হয়রানি ও প্রতিনিয়ত আর্থিক শোষনের শিকার হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও তাদের স্বজনেরা। খুলনা মেডিকেল কলেজ ( খুমেক) হাসপাতাল ও খুলনা জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিদিন গড়ে শত শত ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু উপসর্গের রোগী ভিড় করছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী ডেঙ্গু শনাক্ত করন টেস্ট (NSI) এবং রক্তের  সিবিসি ( CBC) বা প্লাটিলেট কাউন্ট অতি স্বপ্লমুল্যে বা বিনামুল্যে করার বিধান থাকলেও হাসপাতালে নানা অজুহাতে পরিক্ষা বন্ধ রাখা কিংবা দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে। ল্যাবে দীর্ঘ লাইন আর রিপোর্ট  পেতে ঘন্টার পর ঘন্টা বিলম্বের সুযোগ হাসপাতালে সক্রিয় দালালরা। আয়া, ট্রলি চালক ও কিছু কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় রোগীদের ভীড় ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালের ঠিক উল্টো দিকে থাকা অনুমোদনহীন বা কমিশন নির্ভর বেসরকারি প্যাথলজি গুলোতে। বাগেরহাটের ফকিরহাট থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, হাসপাতালে সিবিসি পরিক্ষা করাতে গিয়ে তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সিরিয়াল পাইনি। প্লাটিলেট আশংকাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে দালালদের কথায় বাহিরের এক প্যাথলজিতে যাই। সেখানে একই রক্ত পরিক্ষার জন্য ৮০০ টাকা নিয়েছে, অথচ সরকারি হাসপাতালে খরচ হওয়ার কথা মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আমাদের মতো গরিব মানুষের শেষ সম্বল টুকুও এভাবে কাড়া হচ্ছে। নগরীর রুপসা এলাকা থেকে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা আরেক ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জানান,  ডাক্তার সাহেব প্রেসক্রিপশনে ডেঙ্গু টেস্টের পাশাপাশি এমন কিছু প্যাথলজিক্যাল পরিক্ষা লিখেছেন, যা বাহিরের নিদিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া কেউ করতে পারছে না। এমনকি অন্য প্যাথলজি থেকে একই পরিক্ষা করিয়ে আনলে সেই রিপোর্ট গ্রহণে ডাক্তার গড়িমিসি করেন এবং পুনরায় সেই নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক থেকেই রিপোর্ট করতে বাধ্য করেন। দিনে দুই - তিনবার প্লাটিলেট মাপতেই ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চলে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, খুলনার ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টার গুলোর সাথে চিকিৎসকদের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ( কমিশন) চুক্তি রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ডেঙ্গু টেস্টের সর্বোচ্চ মুল্যে ৫০-৩০০ টাকা নির্ধারন করা হলেও খুলনার অধিকাংশ প্যাথলজি তা মানছে না। এনএস-১, প্লাটিলেট ও সিবিসি টেস্টের নামে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হাকানো হচ্ছে। তদুপরি, অনেক ল্যাবে নিন্ম মানের রিএজেন্ট ব্যবহার করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা রোগীর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। খুলনার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, মহামারীকালীন এই স্বাস্থ্যখাতকে কেন্দ্র করে বানিজ্য চালানো কেবল নৈতিকতার চরম অবক্ষয় নয়, এটি সরাসরি জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অবিলম্বে নামা উচিত। ভুক্তভোগীদের দাবি - খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেসহ সকল সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন ডেঙ্গু পরিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে লাইসেন্সহীন প্যাথলজি, অতিরিক্ত ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ও দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

খুলনায় ডেঙ্গু রোগীদের নিয়ে রমরমা প্যাথলজি বানিজ্য, টেস্টের নামে চরম হয়রানি ও অর্থ লুটের অভিযোগ