সওজে এখনো ‘শামীম’ রাজত্ব: নেপথ্যে তিন প্রভাবশালী প্রকৌশলী
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন খাতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগলেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ঢাকা বিভাগে এখনো রয়ে গেছে সাবেক প্রভাবশালীদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং সাবেক এমপি প্রার্থী আমিনুল ইসলাম শামীম (যিনি ব্যবসায়ী মহলে মো. আমিনুল হক শামীম নামে পরিচিত) এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ ও গুঞ্জন বাড়ছে খোদ সওজের অভ্যন্তরেই। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সওজ ঢাকা বিভাগকে যেন ‘কাঠের পুতুল’ বানিয়ে রেখেছেন এই প্রভাবশালী ঠিকাদার।শত কোটি টাকার লোপাট ও ঢাকা বাইপাস মহাসড়কের বেহাল দশাঅনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা বাইপাস মহাসড়কের উন্নয়নের নামে শামীম এন্টারপ্রাইজ শত শত কোটি টাকা লোপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই মহাসড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা। শুধু তাই নয়, কাঞ্চন সেতু এবং মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক।সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সওজের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসান এই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রশাসনিক এই বলয় টিকিয়ে রাখতে সওজের ভেতরে ‘বিএনপিপন্থী’ হিসেবে পরিচিত দুজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও শীর্ষ কর্মকর্তা সরাসরি মদদ দিচ্ছেন। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সওজের শত শত প্রকৌশলী এখনো এই সিন্ডিকেটের ইশারায় চলতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।শামীম এন্টারপ্রাইজের উত্থান ও ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী নাম Shamim Enterprise (Pvt.) Ltd.। সওজসহ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বড় কাজ একচেটিয়াভাবে বাগিয়ে নেওয়ার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আমিনুল হক শামীমের রাজনৈতিক প্রভাবকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়।গণমাধ্যমের বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদারি খাতে একটি শক্তিশালী ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাধারণ প্রতিযোগীদের বাইরে রেখে শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করত এই চক্র। ২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময়ও এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ নিয়ে শামীমের নাম বারবার আলোচনায় আসে।বিপুল সম্পদ ও রয়্যাল টিউলিপ বিতর্কঠিকাদারি ব্যবসার আড়ালে আমিনুল হক শামীমের বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বহুমুখী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে জনমনে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তার ব্যবসার পরিধি অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে পরিবহন সেক্টর (শামীম এন্টারপ্রাইজ), রিয়েল এস্টেট এবং পর্যটন শিল্প পর্যন্ত বিস্তৃত।বিশেষ করে কক্সবাজারের ইনানীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম বিলাসবহুল ফাইভ স্টার হোটেল ‘রয়্যাল টিউলিপ সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ (Royal Tulip Sea Pearl Beach Resort & Spa) নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—সরকারি প্রকল্পভিত্তিক ব্যবসা এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে এত দ্রুত এই ধরনের মেগা প্রজেক্টের অর্থায়নে রূপান্তরিত হলো।বিশ্লেষকদের মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণসুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসা ও রাজনীতির এই অনৈতিক মেলবন্ধন দেশের উন্নয়ন খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত।অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:"যখন কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর একচেটিয়া কাজ পায়, তখন মুক্ত প্রতিযোগিতা ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে কাজের মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে এবং প্রকল্পের ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়ে। ঢাকা বাইপাস মহাসড়কের বর্তমান কঙ্কালসার দশা তারই প্রমাণ।"অবকাঠামো ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ:"সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—সরকার পরিবর্তনের পরও যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠী বহাল তবিয়তে থাকে, তখন বুঝতে হবে আমলাতন্ত্র ও প্রকৌশলীদের ভেতরে একটি ‘সুবিধাবাদী ও দলছুট সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। নিজেদের আখের গোছাতে কিছু কর্মকর্তা দলের আদর্শ ভুলে দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে নতুন বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না।"আইনগত বাস্তবতা ও বর্তমান পরিস্থিতিযদিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অনেকগুলোরই এখনো আদালতে চূড়ান্ত বিচারিক প্রমাণ মেলেনি, তবুও আমিনুল ইসলাম শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার ব্যবসায়িক আধিপত্যের বিষয়টি দেশের টেন্ডার ও উন্নয়ন খাতে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের মধ্যেও এই প্রভাবশালী নেতার এখনো ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’ থাকা এবং সওজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সাধারণ জনগণের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।