জমির দাগ নম্বরের রহস্য, হাল-সাবেক ও বাটা দাগ চিনবেন যেভাবে
জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকারসূত্রে জমি ভাগ কিংবা মালিকানা যাচাই—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাগ নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খতিয়ান, দলিল ও মৌজা নকশায় থাকা দাগ নম্বরের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জমির অবস্থান, সীমানা ও পরিচয় শনাক্ত করা যায়।তবে বাটা দাগ, ছুট দাগ, সাব দাগ, হাল দাগ ও সাবেক দাগ নিয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। ফলে জমি কেনাবেচার সময় ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।জমির দাগ নম্বর কী?জমির দাগ নম্বর হলো একটি নির্দিষ্ট জমির খণ্ডের পরিচিতি নম্বর। মানুষের পরিচয় যেমন নামের মাধ্যমে, তেমনি জমির পরিচয় প্রকাশ পায় দাগ নম্বরের মাধ্যমে।সরকারের জরিপ বিভাগ একটি মৌজার জমিকে বিভিন্ন খণ্ডে ভাগ করে প্রতিটি খণ্ডের জন্য আলাদা নম্বর দেয়। এই নম্বরের মাধ্যমে জমির অবস্থান ও সীমানা চিহ্নিত করা হয়।একই মালিকের একই মাঠে একাধিক জমি থাকলেও সব জমির নম্বর এক হবে—এমন নয়। দাগ নম্বর মূলত জমির অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।দাগ নম্বর কীভাবে দেওয়া হয়?মৌজা নকশায় দাগ নম্বর সাধারণত মালিকের নাম বা মালিকানার ভিত্তিতে দেওয়া হয় না। জমির অবস্থান ও সীমানার ক্রমানুসারে নম্বর নির্ধারণ করা হয়।জরিপের সময় মাঠের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আইল, সীমানা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে দাগ নম্বর দেওয়া হয়। পরবর্তী জরিপ না হওয়া পর্যন্ত সেই নম্বর কার্যকর থাকে।বাটা দাগ কী?মৌজা নকশা তৈরির সময় কোনো প্লটের নম্বর ভুলক্রমে বাদ পড়ে গেলে পরে সেটি সংশোধনের জন্য যে বিশেষ নম্বর দেওয়া হয়, তাকে বাটা দাগ নম্বর বলা হয়।সাধারণত মূল দাগ নম্বরের সঙ্গে ভগ্নাংশের মতো নতুন নম্বর যুক্ত করা হয়। যেমন কোনো দাগের পাশের নম্বর ৩০১ হলে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া প্লটের নম্বর ৩০১/১ বা ৩০১/২ হতে পারে।ছুট দাগ কী?‘ছুট’ অর্থ বাদ পড়ে যাওয়া। কোনো জমি বা প্লটের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও মৌজা নকশায় ভুলক্রমে তার নম্বর না থাকলে সেটিকে ছুট দাগ বা ছুট নম্বর বলা হয়।আবার পাশাপাশি দুটি জমি একত্র করে একটি দাগ নম্বর দেওয়া হলেও একটি নম্বর বাদ যেতে পারে। সেই বাদ দেওয়া নম্বরও ছুট দাগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।উদাহরণ হিসেবে কোনো মৌজা নকশায় যদি ২৪, ২৫, ২৭ ও ২৮ নম্বর দাগ থাকে, তাহলে ২৬ নম্বরটি ছুট নম্বর হতে পারে।এ ধরনের অস্তিত্বহীন বা বাদ পড়া দাগ নম্বরের ভিত্তিতে জমি কেনাবেচা বা বন্ধক করা হলে ভবিষ্যতে জমি শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।সাব দাগ বা খণ্ড দাগ কী?কোনো জমির অংশ মালিক নিজে বিক্রি, দান বা অন্যভাবে ভাগ করে দিলে সেই অংশকে বোঝাতে অনেক সময় সাব দাগ বা খণ্ড দাগ বলা হয়।তবে জরিপ বিভাগের দেওয়া সরকারি দাগ নম্বর এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত খণ্ড দাগ নম্বর এক বিষয় নয়। ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া খণ্ড দাগ নম্বর জরিপ বিভাগের মূল দাগ নম্বরের মতো সর্বস্তরে আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়।খতিয়ান ও দাগ নম্বরের সম্পর্কখতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বরের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও দুটির নম্বর একই হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।একটি দাগের জমির মালিক একাধিক ব্যক্তি হতে পারেন। উত্তরাধিকার বা বিক্রয়ের মাধ্যমে মালিকের সংখ্যা বাড়লে একই দাগের জমিতে বিভিন্ন ব্যক্তির অংশ তৈরি হতে পারে।খতিয়ানে থাকা নম্বর হলো হাল খতিয়ান নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট জমির নম্বর হলো হাল দাগ নম্বর।জমি বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আগের খতিয়ান ও দাগ নম্বর সাবেক খতিয়ান ও সাবেক দাগ নম্বর হিসেবে উল্লেখ হতে পারে।জমির দলিল যাচাইয়ের সময় যা দেখবেনজমি কেনার আগে শুধু বর্তমান দাগ নম্বর দেখলেই হবে না। দলিল ও খতিয়ানে থাকা হাল ও সাবেক খতিয়ান নম্বর, হাল ও সাবেক দাগ নম্বর এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা জরুরি।দাগ নম্বরের সঙ্গে মৌজা নকশা, খতিয়ান ও দলিলের তথ্যের সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। এতে জমির অবস্থান ও মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধের ঝুঁকি কমানো যায়।জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে তাই দাগ নম্বর শুধু একটি নম্বর নয়; এটি জমির পরিচয় ও অবস্থান শনাক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।লেখক: এ জেড এম শামসুল আলমসাবেক চেয়ারম্যান, অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লি.সাবেক মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারচেয়ারম্যান, আবুজর গিফারী সোসাইটি