বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
চেকপোস্ট

আসামের চা বাগানে অবহেলা: ৭০ বছরেও বদলায়নি শ্রমিকদের জীবন

স্বাধীনতার সাত দশক অতিবাহিত হয়ে গেলেও আসামের চা জনজাতিরা সেই পরাধীনতার কবলেই পড়ে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। বাস্তবিক দৃষ্টিতে এই সম্প্রদায়ের কোনও উন্নতিই দেখা যাচ্ছে না বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। সেই মান্ধাতা আমল থেকে একই অবস্থানে পড়ে রয়েছেন। চা জনজাতিদের নিয়ে, বেশ রসালো গল্প বাজারে চললেও এ অনুযায়ী উন্নতি নেই। শিক্ষা-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বাসস্থান,পানীয়জল সবকিছুতেই পিছিয়ে রয়েছেন। সেই ইংরেজ আমলের অবস্থাতেই রয়েছেন। যেভাবে ইংরেজরা তাদের এনেছিল চা বাগানের কাজ করার জন্য, স্বাধীনোত্তর ভারতের এ অঞ্চলে ওই একই অবস্থায় পড়ে রয়েছেন তারা। যে কোনও সমাজের উন্নয়নের মাপকাঠি নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। আর এই শিক্ষার দিকে চা বাগান এলাকা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। উচ্চ শিক্ষা বলতে নেই বললেও চলে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার স্তরও অত্যন্ত নিম্ন। চা বাগানগুলিতে নিরক্ষর লোকের সংখ্যা অনেক। আসামে যখন চা শিল্প শুরু হয় তখন তাদের আনা হয়েছিল বাগানে কাজ করার জন্য। চা বাগানে কাজ করা ও দিনে দুবেলা দু-মুঠো ভাত-রুটির ব্যবস্থা করাই ছিল তাদের মৌলিক প্রয়োজন। বাড়ির স্ত্রী, পুরুষ থেকে শুরু করে  শিশুরাও বাগানে কাজে যেত। মরদ দফা, রেজা দফা ও চিল্ডরেন দফা এ সব নামে বিভক্ত ছিল কাজের শ্রেণি। বিভাগ অনুযায়ী দেওয়া হত মজুরি। শিশুশ্রমের কোনও বালাই ছিল না। কম বয়সে শিশুরাও কাজে যেত। পড়াশুনার প্রশ্নই উঠে না। খুব কমই ছিল স্কুল প্রয়োজনের তুলনায়। বাগান কর্তৃপক্ষও চাইতেন না শ্রমিকরা পড়াশুনা করুক। আর সেই পুরনো রীতি যেন আজও বদলায়নি। এখনও চা বাগানের শিশুরা বিদ্যালয়ে পুরোদমে যায় না। স্কুলছুট, বিদ্যালয়ে না যাওয়া বিদ্যালয় বহির্ভূত অনেক শিশু, কিশোর রয়েছে। পরিবর্তে চা বাগানে কর্মরত কিশোরদের দেখা যায়। চা বাগানগুলিতে বিদ্যালয়গুলির অবস্থাও ভাল নয়। বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয় এক শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত। মধ্যাহ্ন ভোজন সব বিদ্যালয়ে ঠিকমতো নেই। উন্নয়নও হচ্ছে না।চা বাগান অঞ্চলে বিদ্যালয় সমিতি, চা বাগান শিক্ষা সমিতিগুলি প্রয়োজনের তুলনায় সক্রিয় না থাকায় বিশেষ কোনও উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা নিতান্তই কম। এগুলির অবস্থাও ভাল নয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই বললেই চলে।স্বাস্থ্য পরিসেবার হালও অত্যন্ত শোচনীয় চা বাগান অঞ্চলে। বাগানের সেই পুরনো আমলের ডিসপেনসারিই ভরসা। এগুলিতে পরিকাঠামোগত কোনও সুবিধা নেই। উপযুক্ত নার্স, ডাক্তার নেই, শুধুমাত্র নামেই চলেছে হাসপাতাল গুলো। চায়ের দাম বাজারে কমে যাওয়ার পর থেকে চা বাগানগুলোর আয় কমে গেছে বলে সম্প্রতি এক বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। তাই এর প্রভাব পড়েছে ওই হাসপাতাল গুলোতেও। অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য পরিসেবা এখনও পৌঁছয়নি বললেই চলে চা বাগানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে। এ সব অঞ্চলের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি বন্ধই থাকে। প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধপত্র ও সরঞ্জাম থাকে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরাও যাচ্ছেন না। তাই পরিসেবা থেকে বঞ্চিত জনগণ। চা বাগান এলাকার জনগণের এখনও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা নেই। বেশিরভাগ শিশুর জন্ম অপ্রশিক্ষিত ধাইয়ের দ্বারা বাড়িতে হচ্ছে। ফলে শিশু ও মাতৃ-মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। ফলে হাসপাতালে জন্ম হওয়ার সুযোগ-সুবিধা ও সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সচেতনতার অভাবে। তাছাড়া সচেতনতার অভাবে পরিবার-পরিকল্পনা, গর্ভবতী মায়ের যত্ন, শিশুর জন্ম, পুষ্টিকর খাদ্যকিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় গ্রামীন স্বাস্থ্য কর্মসূচির খুব একটা পরিসেবা নেই বাগান অঞ্চলে। মৃত্যুজয় পরিষেবাও পাচ্ছেন না লোকেরা। বিভিন্ন টালবাহনায় ১০৮ গাড়ি ঢুকছে না বাগানের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে।বাসস্থান বলতে সেই পুরনো আমলের শন, বাঁশ ও মাটির দেওয়ালের তৈরী ঘরই রয়েছে। ইন্দিরা আবাস যোজনার বিশেষ কোনও কৌঁটা নেই বাগানের জন্য। এছাড়াও বেশ কিছু বাগানে বিশেষ আইনের অধীনে পাকা ঘর তৈরি করতে দিচ্ছে না। আর পঞ্চায়েতের দুর্নীতিও বেশি বাগান অঞ্চলে। সব মিলিয়ে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ির অবস্থা মোটেই ভাল নয় এই একবিংশ শতাব্দীতে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগের দু'একটি প্রকল্প থাকলেও বাগান অঞ্চলে এগুলি বন্ধ। ওইসব এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা নদী, নালা, ছড়া ও কাঁচা কুয়োর অপরিশোধিত জল। আর এর জন্যই প্রায়ই এ সব অঞ্চলে জলবাহিত রোগ দেখা যায়।

আসামের চা বাগানে অবহেলা: ৭০ বছরেও বদলায়নি শ্রমিকদের জীবন