রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

বেকার লক্ষাধিক শ্রমিক, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে মালিকরা

‘সোনালি আঁশ’খ্যাত কাঁচা পাট রপ্তানির মাধ্যমে শত বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে পাট খাত। একসময় বিশ্বের ৪৭টি দেশে কাঁচা পাট রপ্তানি হলেও বর্তমানে তা কমে ৮-১০টি দেশে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবসায়িক মন্দায় ইতোমধ্যে অনেক জুট প্রেস বন্ধ হয়ে গেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা ৪০টির বেশি জুট প্রেস এখন কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।জুট প্রেস মালিকদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক এবং প্রায় ২০ হাজার কর্মচারী কাজ করতেন। কিন্তু গত এক বছর ধরে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা জুট প্রেস মালিকরাও ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিন রপ্তানি বন্ধ থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ দৌলতপুরেও সংকট দৌলতপুর খুলনা জুট প্রেস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আখতার হোসেন ফিরোজ বলেন, একসময় দৌলতপুর ছিল দেশের কাঁচা পাট রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ অঞ্চলকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’।তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে ও পরে খুলনার রেলিগেট থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত ভৈরব নদীর তীর ঘেঁষে ১০-১২টি জুট প্রেস গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। পাট রপ্তানিকে ঘিরে শ্রমিক, কর্মচারী, রপ্তানিকারক, প্রেস মালিক, পাটচাষি, আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল।স্বাধীনতার পরও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বছরে ৩৫-৪০ লাখ বেল পাট রপ্তানি হতো বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।তবে তাঁর অভিযোগ, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এতে দৌলতপুরসহ সারাদেশে পাট রপ্তানির সঙ্গে জড়িত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ, তবু বন্ধ প্রেস আখতার হোসেন ফিরোজ বলেন, জুট প্রেস চালু থাকুক বা না থাকুক, মালিকদের নিয়মিত সরকারি খাজনা, সিটি করপোরেশনের কর, জমির খাজনা, বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।তিনি বলেন, একটি জুট প্রেস সাধারণত তিন থেকে ১৫ একর জায়গার ওপর স্থাপিত। সেখানে ওয়্যারহাউস, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিটি প্রেসে কমপক্ষে ৫০-৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মালিকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।‘বিদেশি ক্রেতা হারিয়ে গেলে পরে বাজার পাওয়া কঠিন’ আখতার হোসেন ফিরোজ বলেন, ১৯৯০ সালে তিন একর জায়গার ওপর ‘ইউনাইটেড জুট প্রেস’ নামে তাঁর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে একসময় সহস্রাধিক শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন।তিনি বলেন, এক বছর ধরে পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, জমির খাজনা ও সিটি করপোরেশনের কর দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রেসের যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে।তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প ব্যবসায় চলে যেতে পারেন। কেউ কেউ মিলের কাঠামো পরিবর্তন করে অন্য কারখানা স্থাপন করলে ভবিষ্যতে সরকার রপ্তানির অনুমতি দিলেও আগের ক্রেতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।পাটের দাম কমায় কৃষকরাও দুশ্চিন্তায় পাট রপ্তানি বন্ধের প্রভাব শুধু জুট প্রেস বা শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; কৃষকরাও এর প্রভাব অনুভব করছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।আখতার হোসেন ফিরোজ বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর পাটের বাফার স্টক তৈরি হয়েছে। বর্তমানে পাটের দাম প্রতি মণ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে। রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় কৃষকের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।ভবিষ্যতেও এ ধরনের দাম অব্যাহত থাকলে কৃষকরা পাট উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।তাঁর দাবি, এ বছর উৎপাদিত পাট থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও ৩০-৩৫ লাখ বেল পাট রপ্তানি করা সম্ভব।দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি দেশের পাটচাষি, শ্রমিক, কর্মচারী, আড়তদার, মজুদদার, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও জুট প্রেস মালিকদের স্বার্থ বিবেচনায় অতি দ্রুত কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আখতার হোসেন ফিরোজ।তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের মতো দৌলতপুরের কয়েকটি জুট প্রেসসহ সারাদেশের বহু জুট প্রেস বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি, পাটচাষি ও শ্রমিকসহ পাট খাতের সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষ।

বেকার লক্ষাধিক শ্রমিক, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে মালিকরা