খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার আইন যেভাবে
দক্ষিণ এশিয়ার আইনব্যবস্থায় ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের পৃথক আইনি কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশেও খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইন এবং উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নজির রয়েছে।খ্রিস্টানদের উত্তরাধিকার মূলত ১৯২৫ সালের ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হলেও বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভিন্ন আইনি অবস্থান রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।খ্রিস্টানদের উত্তরাধিকার আইনবাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বণ্টনের বিধান মূলত ১৯২৫ সালের ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।১৯২৫ সালের ৩৯ নম্বর এই আইনের চতুর্থ খণ্ডের ২৪ থেকে ২৮ ধারা এবং পঞ্চম খণ্ডের ২৯ থেকে ৪৯ ধারায় খ্রিস্টানদের উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান রয়েছে।অর্থাৎ, কোনো খ্রিস্টান ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান প্রযোজ্য হয়।বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার আইন কী?বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার আইন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।ভারতে ১৯৫৬ সালের সংশোধিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের আওতায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এমন কোনো আইনগত সংশোধন করা হয়নি।বিষয়টি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়েও স্পষ্ট হয়েছে। দেওয়ানি আপিল নম্বর ৪০/১৯৮৪ মামলায় বিষয়টি বিবেচনায় আসে। মামলাটি ছিল করতমালা লক্ষ্মী বিহারী বনাম হৃদয় রঞ্জন চৌধুরী গং।আপিলে বিবেচনার বিষয় ছিল—বাংলাদেশের বৌদ্ধরা উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে হিন্দু আইন দ্বারা পরিচালিত কি না।সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ৩২ ডিএলআর ১৮৭-এ প্রকাশিত অজিতানন্দ বনাম অগ্রভাংশ মামলার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভারতে ১৯৫৬ সালে হিন্দু আইন সংশোধন করে বৌদ্ধদের সেই আইনের আওতায় আনা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো সংশোধন করা হয়নি।ফলে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে হিন্দু আইন দ্বারা পরিচালিত—এমনটি বলা যায় না।এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার আইন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী ভারতে বৌদ্ধদের জন্য যে আইনি বিধান রয়েছে, তা বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।সম্পত্তি বণ্টনে পারিবারিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণউত্তরাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে উত্তরাধিকারীর পারিবারিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে কতটা সম্পত্তির অধিকারী হবেন, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইনের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কের ক্রম ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করতে হয়।সম্পর্ক গণনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শাখা ও ধাপ রয়েছে। এসব ধাপের ভিত্তিতেই উত্তরাধিকারীর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়।তাই শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেই সম্পত্তিতে সমান বা স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি হয় না; সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়।কেন উত্তরাধিকার আইন জানা জরুরি?পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অন্যতম কারণ হলো উত্তরাধিকারীদের অধিকার সম্পর্কে অস্পষ্টতা। তাই সম্পত্তি বণ্টনের আগে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।বিশেষ করে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ভারতের আইন এবং বাংলাদেশের আইনের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ১৯৫৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে বৌদ্ধদের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের আওতায় আনা হলেও বাংলাদেশে এমন কোনো আইনগত পরিবর্তন হয়নি—উচ্চ আদালতের নজিরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।ফলে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কোনো বিরোধ দেখা দিলে অনুমান বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের নজির বিবেচনা করা প্রয়োজন।সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার বা বণ্টন নিয়ে জটিলতা থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আদালতের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ।সম্পাদনা ও পরিকল্পনা:এডভোকেট এম. এম. রহমানবি.কম (অনার্স), এম.কম, এলএলবিরচনায়:আনিছুর রহমানএম.এ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়