শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
চেকপোস্ট

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত আদনান আজাদ ও হাসমত আলীকে সংবর্ধনা

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে জাতীয় স্বীকৃতি অর্জন করায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত আদনান আজাদ ও অধ্যাপক মো. হাসমত আলীকে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ও সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার (সোয়ান)।শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আকরাম খা হলরুমে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ অর্জন করায় আদনান আজাদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫ অর্জন করায় অধ্যাপক মো. হাসমত আলীকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।বিবিসিএফের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আরাফাত রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিবিসিএফের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোল্যা রেজাউল করিম, ড. এস এম ইকবাল, আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু, বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি বাপ্পি খান, অধ্যাপক টিপু সুলতান, কৃষিবিদ শহিদুর রহমান ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠু।আয়োজকেরা জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন ও তাদের স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এটি শুধু সংবর্ধনা নয়, দেশজুড়ে কাজ করা সংরক্ষণকর্মীদের আনন্দ ভাগাভাগিরও একটি উপলক্ষ।জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী আদনান আজাদ বলেন, এ স্বীকৃতি তাঁর একার অর্জন নয়; দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করা অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী, সহকর্মী ও সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তিনি বলেন, শুধু বন্যপ্রাণী উদ্ধার নয়, প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিজের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আদনান আজাদ বলেন, সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন। বিবিসিএফের বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করেছে বলেও জানান তিনি।জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. হাসমত আলী বলেন, প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন—একটি গাছ, প্রজাপতি, পাখি কিংবা ছোট জলাভূমিও বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।হাসমত আলী বলেন, জাতীয় পরিবেশ পদক তাঁকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষা নিয়ে আরও কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।বিবিসিএফের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, আদনান আজাদ শুধু একজন বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী নন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংরক্ষণকর্মীদের একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিবিসিএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।ড. এস এম ইকবাল বলেন, কোনো প্রাণীকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমে মানুষের কাছে সেই প্রাণীর গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণীর উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি না হলে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন।আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আদনান আজাদের দীর্ঘদিনের কাজ জাতীয় পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি পেয়েছে। পুরস্কার পাওয়ার অর্থ কাজ শেষ নয়, বরং দায়িত্ব আরও বেড়ে যাওয়া। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।কৃষিবিদ শহিদুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু বন বা অভয়ারণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বসতি ও কৃষিজমির সঙ্গেও বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় ও অপ্রচলিত ফলের গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠু বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, গত ২০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ প্রজাতি হারিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য সতর্কবার্তা। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি বাপ্পি খান বলেন, মাঠপর্যায়ে বন্যপ্রাণী ও প্রাণীকল্যাণ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর কাজ তরুণদের সংরক্ষণ কার্যক্রমে উৎসাহিত করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিন বলেন, এ আয়োজনকে শুধু সংবর্ধনা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংরক্ষণকর্মীদের আনন্দ ভাগাভাগিরও একটি উপলক্ষ। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর অর্জনকে তিনি দেশের বিশাল স্বেচ্ছাসেবী সংরক্ষণ পরিবারের অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।ড. নাছির উদ্দিন আরও বলেন, বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করা হলে দেশের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী, গবেষক ও তরুণদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।ভবিষ্যতে বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন ও দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে স্থানীয় পর্যায়ের সংরক্ষণ উদ্যোগগুলোকে জাতীয় সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন বক্তারা।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত আদনান আজাদ ও হাসমত আলীকে সংবর্ধনা