
হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার ৬নং শাহজাহানপুর ইউনিয়নের তেলিয়াপাড়া চা বাগান এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে, এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন চা-শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীর দাবি, পঞ্চায়েত নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সংক্রান্ত মামলার অন্যতম আসামি, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শাহজাহানপুর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি খোকন পান তাতী এবং লালন পাহান নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ওপর একতরফা ও অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, খোকন পান তাতী দীর্ঘদিন ধরে চা বাগানের কুখ্যাত মাদক কারবারিদের আশ্রয় ও মদত দিয়ে আসছেন।
এর ফলে চা বাগানের বস্তি এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যেতে পারছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন শতশত যানবাহনে বহিরাগতরা মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে মাদককারবারিদের বাড়িতে যাতায়াত করছে, যা পুরো এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হলেও পতিত স্বৈরাচার সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার ভয় দেখিয়ে সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া হতো।
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে স্বরজিত পাশী নামের এক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ভূমিকা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা ‘শেল্টার’ হিসেবে কাজ করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বৈরাচারী সরকারের আমলে অভিযুক্তদের দাপট এতটাই ছিল যে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে কাউকে আটক না করেই ফিরে যেতে হয়েছে।
চা বাগান এলাকায় নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। শ্রমিকদের মজুরি, কাজের সুযোগ এবং দৈনন্দিন জীবন ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। যারা প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছেন, তাদের হুমকি দেওয়া, সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে পঞ্চায়েত সভাপতি খোকন পান তাতীর সম্পদের উৎস। স্থানীয়দের প্রশ্ন, দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরির চাকরি করেও কীভাবে তিনি প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি ভবন নির্মাণ করেছেন, তা নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ আয়ের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও আজ পর্যন্ত কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান তদন্ত হয়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, যার মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সংক্রান্ত একটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।
চা-শ্রমিক ও এলাকাবাসী অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।