রাতের আঁধারে এক্সেভেটর-ট্রাকে মাটি পাচার
লাখাইয়ে মাটিখেঁকোদের দৌরাত্ম্য, কৃষি ও পরিবেশ হুমকিতে

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় অবৈধ মাটি উত্তোলন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল, সরকারি খাল-নালা ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুম এলেই লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে সক্রিয় হয়ে ওঠে মাটি খেঁকো চক্র। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত এক্সেভেটর ও ড্রেজার মেশিন দিয়ে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। পরে ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে সেই মাটি উপজেলার ভেতরে ও বাইরে সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মাটির বড় অংশ ইটভাটায় যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করাব, মোড়াকরি, বামৈ, মুড়িয়াউক ও বুল্লা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠে নিয়মিতভাবে কৃষিজমির টপসয়েল কাটা হচ্ছে। একশ্রেণির ভূমি মালিক সাময়িক লাভের আশায় জমির মাটি বিক্রি করছেন। আবার কেউ মাছ চাষের নামে কৃষিজমিতে পুকুর খনন করে মূল্যবান মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর ফলে আশপাশের জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অবৈধভাবে উত্তোলিত মাটি দিয়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য সরকারি খাল, নালা ও জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি জমি বেদখল হচ্ছে, অন্যদিকে খাল-নালা বন্ধ হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাটি পরিবহনের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তঃইউনিয়ন সড়কের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের মতো করে কেটে ডাইভারশন তৈরি করেছে মাটি ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, বেপরোয়া গতির ট্রাক ও ট্রাক্টরের শব্দে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। যন্ত্রদানবের মতো এসব যানবাহন যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবে মাটি ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও ভয় পাচ্ছেন।
বামৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আজাদ হোসেন ফুরুক বলেন, “অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ জরুরি। না হলে লাখাইয়ের কৃষি, সড়ক ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, “অবৈধ মাটি উত্তোলন বন্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। তবে জনবল সংকটের কারণে তা নিয়মিত জোরদার করা সম্ভব হচ্ছে না। একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদায়ন হলে অভিযান আরও শক্তিশালী করা যাবে।”


























