ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণভোট বিষয়ে নেই সচেতনতা, বাড়ছে বিভ্রান্তির শঙ্কা

গণভোট কী? জানেন না হবিগঞ্জের চা বাগানের শ্রমিকরা

ফয়সাল আহমেদ পলাশ::
120

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক গণভোট। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু হলেও সেই কার্যক্রম এখনো মূলত জেলা শহর ও পৌর এলাকাকেন্দ্রিকই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চল ও চা বাগানের সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ গণভোট বিষয়ে রয়ে গেছে সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

হবিগঞ্জ জেলার ২৪টি চা বাগানে বসবাসরত প্রায় দুই লাখের বেশি ভোটারের একটি বড় অংশই জানেন না-গণভোট কী, কেন এই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিংবা এতে কীভাবে অংশ নিতে হবে। সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে সীমিত ধারণা থাকলেও, একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট তাদের কাছে এখনো অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর।

মাধবপুর, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার নালুয়া, চান্দপুর, বিন্দাবন, বৈকণ্ঠপুর, লস্করপুর, তেলিয়াপাড়া, রশিদপুর, ইমামবাড়ি ও বাউয়াইনসহ একাধিক চা বাগান ঘুরে নারী ও পুরুষ শ্রমিক ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায় উদ্বেগজনক কথ।

চা শ্রমিকরা জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এ তথ্য তারা জানেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য প্রার্থীরাও নিয়মিত ভোট চাইতে আসছেন। কিন্তু গণভোট কী, কেন হচ্ছে কিংবা ভোটের দিন আলাদা কোনো ব্যালট বা সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এ বিষয়ে কেউ তাদের কিছুই বলেননি।

একাধিক নারী শ্রমিক বলেন, আমরা কখনো গণভোট দেইনি। এই ভোট কী, কীভাবে দিতে হবে, এটা কেউ আমাদের জানায়নি। ভোটের দিন কী করতে হবে, তা নিয়েই ভয় ও দ্বিধা কাজ করছে।

গণভোট সম্পর্কে শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই নন, চা বাগানের শ্রমিক নেতা, পঞ্চায়েত সর্দার এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেও স্পষ্ট ধারণার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশই জানিয়েছেন, ‘গণভোট’ শব্দটি তারা খুব কম শুনেছেন, আবার কেউ কেউ একেবারেই জানেন না বিষয়টি কী।

তবে অনেক শ্রমিক ও নেতা মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তাদের ভাষায়, “যদি আমাদের মতামতের মূল্য থাকে, তাহলে সেটা জানার অধিকারও আমাদের থাকা উচিত।”

চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেতা কাঞ্চন পাত্র বলেন, গণভোট’ শব্দটা আমরা খুব কমই শুনেছি। বিষয়টা যদি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে চা শ্রমিকদের আগে জানানো দরকার। কারণ আমরাও দেশের নাগরিক, আমাদের ভোটের মূল্য আছে।
তিনি বলেন, চা বাগানের শ্রমিকরা সাধারণত নির্দেশনা অনুযায়ী ভোট দেন। কিন্তু গণভোটের মতো বিষয়ে যদি আগে থেকে প্রশিক্ষণ বা প্রচারণা না হয়, তাহলে শ্রমিকরা বুঝবে না কোন সিদ্ধান্ত কী অর্থ বহন করে।

অপর এক শ্রমিক নেতা বলেন, প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা ভোট চাইতে এলেও গণভোটের কথা কেউ বলেন না। ফলে শ্রমিকরা ভাবছে, একই দিনে হঠাৎ করে আলাদা আরেকটা ভোট কেন। এটা পরিষ্কার না হলে ভোটের দিন বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

চান্দপুর চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি চন্দ্রকর্মকার বলেন, “আমরা সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে জানি, ভোট কীভাবে দিতে হয় সেটাও জানা। কিন্তু গণভোট বিষয়টা আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। কী প্রশ্নে ভোট হবে, কীভাবে ভোট দিতে হবে, এ বিষয়ে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। আগে আমাদের বোঝাতে হবে, তারপরই আমরা শ্রমিকদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, চা বাগান এলাকায় লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক, মাইকিং ও সরাসরি আলোচনা হলে শ্রমিকদের মধ্যে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, খুব শিগগিরই চা বাগানগুলোতে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা ও প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বলেন, “চা বাগানের শ্রমিকরা যেন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সঠিকভাবে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে।”

একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, চা বাগানের মতো পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গণভোটের বার্তা এখনো না পৌঁছানো গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সময়মতো কার্যকর প্রচারণা ও সরাসরি যোগাযোগ না হলে ভোটের দিনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১১:৫০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
৫৬৫ বার পড়া হয়েছে

গণভোট বিষয়ে নেই সচেতনতা, বাড়ছে বিভ্রান্তির শঙ্কা

গণভোট কী? জানেন না হবিগঞ্জের চা বাগানের শ্রমিকরা

আপডেট সময় ১১:৫০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
120

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক গণভোট। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা শুরু হলেও সেই কার্যক্রম এখনো মূলত জেলা শহর ও পৌর এলাকাকেন্দ্রিকই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চল ও চা বাগানের সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ গণভোট বিষয়ে রয়ে গেছে সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

হবিগঞ্জ জেলার ২৪টি চা বাগানে বসবাসরত প্রায় দুই লাখের বেশি ভোটারের একটি বড় অংশই জানেন না-গণভোট কী, কেন এই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিংবা এতে কীভাবে অংশ নিতে হবে। সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে সীমিত ধারণা থাকলেও, একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট তাদের কাছে এখনো অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর।

মাধবপুর, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার নালুয়া, চান্দপুর, বিন্দাবন, বৈকণ্ঠপুর, লস্করপুর, তেলিয়াপাড়া, রশিদপুর, ইমামবাড়ি ও বাউয়াইনসহ একাধিক চা বাগান ঘুরে নারী ও পুরুষ শ্রমিক ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায় উদ্বেগজনক কথ।

চা শ্রমিকরা জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এ তথ্য তারা জানেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য প্রার্থীরাও নিয়মিত ভোট চাইতে আসছেন। কিন্তু গণভোট কী, কেন হচ্ছে কিংবা ভোটের দিন আলাদা কোনো ব্যালট বা সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এ বিষয়ে কেউ তাদের কিছুই বলেননি।

একাধিক নারী শ্রমিক বলেন, আমরা কখনো গণভোট দেইনি। এই ভোট কী, কীভাবে দিতে হবে, এটা কেউ আমাদের জানায়নি। ভোটের দিন কী করতে হবে, তা নিয়েই ভয় ও দ্বিধা কাজ করছে।

গণভোট সম্পর্কে শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই নন, চা বাগানের শ্রমিক নেতা, পঞ্চায়েত সর্দার এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেও স্পষ্ট ধারণার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশই জানিয়েছেন, ‘গণভোট’ শব্দটি তারা খুব কম শুনেছেন, আবার কেউ কেউ একেবারেই জানেন না বিষয়টি কী।

তবে অনেক শ্রমিক ও নেতা মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তাদের ভাষায়, “যদি আমাদের মতামতের মূল্য থাকে, তাহলে সেটা জানার অধিকারও আমাদের থাকা উচিত।”

চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেতা কাঞ্চন পাত্র বলেন, গণভোট’ শব্দটা আমরা খুব কমই শুনেছি। বিষয়টা যদি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে চা শ্রমিকদের আগে জানানো দরকার। কারণ আমরাও দেশের নাগরিক, আমাদের ভোটের মূল্য আছে।
তিনি বলেন, চা বাগানের শ্রমিকরা সাধারণত নির্দেশনা অনুযায়ী ভোট দেন। কিন্তু গণভোটের মতো বিষয়ে যদি আগে থেকে প্রশিক্ষণ বা প্রচারণা না হয়, তাহলে শ্রমিকরা বুঝবে না কোন সিদ্ধান্ত কী অর্থ বহন করে।

অপর এক শ্রমিক নেতা বলেন, প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা ভোট চাইতে এলেও গণভোটের কথা কেউ বলেন না। ফলে শ্রমিকরা ভাবছে, একই দিনে হঠাৎ করে আলাদা আরেকটা ভোট কেন। এটা পরিষ্কার না হলে ভোটের দিন বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

চান্দপুর চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি চন্দ্রকর্মকার বলেন, “আমরা সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে জানি, ভোট কীভাবে দিতে হয় সেটাও জানা। কিন্তু গণভোট বিষয়টা আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। কী প্রশ্নে ভোট হবে, কীভাবে ভোট দিতে হবে, এ বিষয়ে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। আগে আমাদের বোঝাতে হবে, তারপরই আমরা শ্রমিকদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, চা বাগান এলাকায় লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক, মাইকিং ও সরাসরি আলোচনা হলে শ্রমিকদের মধ্যে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, খুব শিগগিরই চা বাগানগুলোতে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা ও প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বলেন, “চা বাগানের শ্রমিকরা যেন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সঠিকভাবে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে।”

একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, চা বাগানের মতো পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গণভোটের বার্তা এখনো না পৌঁছানো গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সময়মতো কার্যকর প্রচারণা ও সরাসরি যোগাযোগ না হলে ভোটের দিনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।