বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

সারাদেশ

কৃষি ব্যাংকের ঋণ না পেয়ে বিপাকে দেউন্দি টি কোম্পানি, বিকল্প ঋণে চার বাগানের শ্রমিকদের মজুরি-রেশন প্রদান

কৃষি ব্যাংকের ঋণ না পেয়ে বিপাকে দেউন্দি টি কোম্পানি, বিকল্প ঋণে চার বাগানের শ্রমিকদের মজুরি-রেশন প্রদান
ছবি: চেকপোস্ট

 বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণ এখনো ছাড় না হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে হবিগঞ্জের দেউন্দি টি কোম্পানি। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ১০ দিন বন্ধ থাকার পর কোম্পানির অধীন চারটি চা বাগানের শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি ও রেশন পরিশোধ করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের হাতে মজুরি ও রেশন তুলে দেওয়া হয়।

দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন বাগানগুলো হলো—মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগান এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার লালচান্দ ও দেউন্দি চা বাগান এবং মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগান।

বাগান সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ অক্টোবর (সোমবার) শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। ফলে চারটি চা বাগানে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১০ দিন কর্মবিরতি ও অচলাবস্থায় চা-পাতা নষ্ট হওয়াসহ কোম্পানির কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) শ্রমিকদের আরও এক সপ্তাহের মজুরি ও রেশন এবং বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) দুই সপ্তাহের মজুরি ও রেশন পরিশোধ করা হবে।

এদিকে বকেয়া মজুরি, রেশন ও অন্যান্য পাওনা না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন শ্রমিক পরিবারগুলো। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে চারটি চা বাগান চালু করা এবং শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের দাবিতে গত ১ নভেম্বর হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টরা। জেলা প্রশাসক বিষয়টি বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মজুরি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে।

কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণের অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় ছিল কর্তৃপক্ষ। ঋণ পাওয়ার আশ্বাসে বাগান পরিচালনার চেষ্টা করলেও অর্থ ছাড় না হওয়ায় আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের মজুরি ও রেশন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২২ সাল থেকে দেউন্দি টি কোম্পানি নানা আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চায়ের নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে জমা দিতে হয়। অন্যদিকে চা-পাতার মূল্য প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় আয় কমে যাওয়ায় কোম্পানির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি চারটি বাগানে বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি ও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কোম্পানির ১৫ থেকে ১৬টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। লালচান্দ চা বাগানে বৈদ্যুতিক সার্কিট থেকে আগুন লেগে চা কারখানা পুড়ে যায়। এতে প্রায় ১২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কারখানা মেরামতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

অন্যদিকে নোয়াপাড়া চা বাগানে জালালাবাদ গ্যাসের বিল বকেয়া থাকায় কয়েক বছর চা কারখানার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ চালু করা হয়। কারখানা বন্ধ থাকায় কাঁচা চা-পাতা অন্যত্র কম দামে বিক্রি করে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে শ্রমিকদের দুর্দশার খবর পেয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি আলহাজ সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলের ছেলে এবং সায়হাম নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ শাফক্বাত আহমেদ। গত ৩ নভেম্বর চারটি চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের মধ্যে পাঁচ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এতে প্রায় ১৭ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে চাল বিতরণ নিয়ে শ্রমিকদের একাংশের মধ্যে অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, দেউন্দি চা বাগানের চাকরিচ্যুত সাবেক শ্রমিক নেতা উজ্জ্বল কুমার দাশের মাধ্যমে পাঁচ কেজির পরিবর্তে কোনো কোনো পরিবারকে চার কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাগানের বিভিন্ন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি ও ক্ষতিসাধনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তুলেছেন কয়েকজন শ্রমিক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, ব্যাংকঋণ ছাড়ে বিলম্ব, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেউন্দি টি কোম্পানির চারটি চা বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে মজুরি ও রেশন পরিশোধ নয়, বাগানগুলোর স্থায়ী আর্থিক সংকট নিরসন এবং নিয়মিত মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

চেকপোস্ট

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


কৃষি ব্যাংকের ঋণ না পেয়ে বিপাকে দেউন্দি টি কোম্পানি, বিকল্প ঋণে চার বাগানের শ্রমিকদের মজুরি-রেশন প্রদান

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

 বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণ এখনো ছাড় না হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে হবিগঞ্জের দেউন্দি টি কোম্পানি। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ১০ দিন বন্ধ থাকার পর কোম্পানির অধীন চারটি চা বাগানের শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি ও রেশন পরিশোধ করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের হাতে মজুরি ও রেশন তুলে দেওয়া হয়।


দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন বাগানগুলো হলো—মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগান এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার লালচান্দ ও দেউন্দি চা বাগান এবং মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগান।


বাগান সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ অক্টোবর (সোমবার) শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। ফলে চারটি চা বাগানে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১০ দিন কর্মবিরতি ও অচলাবস্থায় চা-পাতা নষ্ট হওয়াসহ কোম্পানির কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) শ্রমিকদের আরও এক সপ্তাহের মজুরি ও রেশন এবং বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) দুই সপ্তাহের মজুরি ও রেশন পরিশোধ করা হবে।


এদিকে বকেয়া মজুরি, রেশন ও অন্যান্য পাওনা না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন শ্রমিক পরিবারগুলো। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে চারটি চা বাগান চালু করা এবং শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের দাবিতে গত ১ নভেম্বর হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টরা। জেলা প্রশাসক বিষয়টি বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মজুরি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে।


কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণের অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় ছিল কর্তৃপক্ষ। ঋণ পাওয়ার আশ্বাসে বাগান পরিচালনার চেষ্টা করলেও অর্থ ছাড় না হওয়ায় আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের মজুরি ও রেশন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়।


সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২২ সাল থেকে দেউন্দি টি কোম্পানি নানা আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চায়ের নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে জমা দিতে হয়। অন্যদিকে চা-পাতার মূল্য প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় আয় কমে যাওয়ায় কোম্পানির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।


এর পাশাপাশি চারটি বাগানে বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি ও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কোম্পানির ১৫ থেকে ১৬টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। লালচান্দ চা বাগানে বৈদ্যুতিক সার্কিট থেকে আগুন লেগে চা কারখানা পুড়ে যায়। এতে প্রায় ১২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কারখানা মেরামতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।


অন্যদিকে নোয়াপাড়া চা বাগানে জালালাবাদ গ্যাসের বিল বকেয়া থাকায় কয়েক বছর চা কারখানার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ চালু করা হয়। কারখানা বন্ধ থাকায় কাঁচা চা-পাতা অন্যত্র কম দামে বিক্রি করে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।


এদিকে শ্রমিকদের দুর্দশার খবর পেয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি আলহাজ সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলের ছেলে এবং সায়হাম নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ শাফক্বাত আহমেদ। গত ৩ নভেম্বর চারটি চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের মধ্যে পাঁচ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এতে প্রায় ১৭ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


তবে চাল বিতরণ নিয়ে শ্রমিকদের একাংশের মধ্যে অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, দেউন্দি চা বাগানের চাকরিচ্যুত সাবেক শ্রমিক নেতা উজ্জ্বল কুমার দাশের মাধ্যমে পাঁচ কেজির পরিবর্তে কোনো কোনো পরিবারকে চার কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাগানের বিভিন্ন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি ও ক্ষতিসাধনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তুলেছেন কয়েকজন শ্রমিক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, ব্যাংকঋণ ছাড়ে বিলম্ব, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেউন্দি টি কোম্পানির চারটি চা বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে মজুরি ও রেশন পরিশোধ নয়, বাগানগুলোর স্থায়ী আর্থিক সংকট নিরসন এবং নিয়মিত মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত