শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা বাড়ে, আবার জোঁকের তেল নাকি বাত-ব্যথাসহ নানা রোগের চিকিৎসা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
কিন্তু এসব দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা? সত্যিই কি এসব প্রাণী বা তাদের দেহ থেকে তৈরি উপাদান রোগ সারাতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জোঁকের ক্ষেত্রেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহারের নজির থাকলেও বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’কে নানা রোগের চিকিৎসা হিসেবে দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ।
এর পাশাপাশি শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ রয়েছে এমন বিশ্বাসও রয়েছে। হাঁপানি, বাতসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ ভালো করার দাবিতে কোথাও কোথাও শিয়াল শিকার ও হত্যার ঘটনাও ঘটে।
তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস খেলে এসব রোগ ভালো হয় এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এমনকি এসব গুজবকে কাজে লাগিয়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।
তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণ বা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এ ধরনের গুজবের কারণে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে এবং বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় দেশে তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও পাচার ও অবৈধভাবে সংগ্রহের কারণে তক্ষক নিয়ে সংরক্ষণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সব ধরনের জোঁক ব্যবহার করা হয় না। নির্দিষ্ট ধরনের মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহার করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে জমে থাকা রক্ত অপসারণে চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন নির্দিষ্ট ধরনের রক্ত জমাট বা অস্ত্রোপচারের পর জটিলতায়, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
তবে বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’ দিয়ে বাত, কোমরব্যথা, যৌন সমস্যা কিংবা নানা রোগ সারানোর দাবি আলাদা বিষয়। এসব দাবির কার্যকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাই চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিকেটেড জোঁক এবং বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত জোঁকের তেলকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এসব লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাণী বা তার দেহের অংশ রোগ সারাতে পারে কি না, তা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬ আইনে খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তক্ষককেও সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা নিষিদ্ধ।
ফলে লোকবিশ্বাসের কারণে এসব প্রাণী শিকার বা বেচাকেনা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, আইনগত সমস্যারও কারণ হতে পারে।
রোগ সারানোর দাবির আগে প্রমাণ জরুরি। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া কোনো প্রাণী, প্রাণীর দেহাংশ বা অজানা তেলকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই রোগ হলে লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা বাড়ে, আবার জোঁকের তেল নাকি বাত-ব্যথাসহ নানা রোগের চিকিৎসা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
কিন্তু এসব দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা? সত্যিই কি এসব প্রাণী বা তাদের দেহ থেকে তৈরি উপাদান রোগ সারাতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জোঁকের ক্ষেত্রেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহারের নজির থাকলেও বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’কে নানা রোগের চিকিৎসা হিসেবে দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ।
এর পাশাপাশি শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ রয়েছে এমন বিশ্বাসও রয়েছে। হাঁপানি, বাতসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ ভালো করার দাবিতে কোথাও কোথাও শিয়াল শিকার ও হত্যার ঘটনাও ঘটে।
তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস খেলে এসব রোগ ভালো হয় এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এমনকি এসব গুজবকে কাজে লাগিয়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।
তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণ বা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এ ধরনের গুজবের কারণে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে এবং বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় দেশে তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও পাচার ও অবৈধভাবে সংগ্রহের কারণে তক্ষক নিয়ে সংরক্ষণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সব ধরনের জোঁক ব্যবহার করা হয় না। নির্দিষ্ট ধরনের মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহার করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে জমে থাকা রক্ত অপসারণে চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন নির্দিষ্ট ধরনের রক্ত জমাট বা অস্ত্রোপচারের পর জটিলতায়, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
তবে বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’ দিয়ে বাত, কোমরব্যথা, যৌন সমস্যা কিংবা নানা রোগ সারানোর দাবি আলাদা বিষয়। এসব দাবির কার্যকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাই চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিকেটেড জোঁক এবং বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত জোঁকের তেলকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এসব লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাণী বা তার দেহের অংশ রোগ সারাতে পারে কি না, তা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬ আইনে খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তক্ষককেও সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা নিষিদ্ধ।
ফলে লোকবিশ্বাসের কারণে এসব প্রাণী শিকার বা বেচাকেনা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, আইনগত সমস্যারও কারণ হতে পারে।
রোগ সারানোর দাবির আগে প্রমাণ জরুরি। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া কোনো প্রাণী, প্রাণীর দেহাংশ বা অজানা তেলকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই রোগ হলে লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
