শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

শিয়ালের মাংস, তক্ষক, জোঁকের তেল সত্যিই কি রোগ সারায়?

শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা বাড়ে, আবার জোঁকের তেল নাকি বাত-ব্যথাসহ নানা রোগের চিকিৎসা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।কিন্তু এসব দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা? সত্যিই কি এসব প্রাণী বা তাদের দেহ থেকে তৈরি উপাদান রোগ সারাতে পারে?বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জোঁকের ক্ষেত্রেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহারের নজির থাকলেও বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’কে নানা রোগের চিকিৎসা হিসেবে দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ।বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়াল নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত। কেউ মনে করেন শিয়াল অশুভ, আবার কোথাও শিয়ালকে হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশুর জন্য ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয়।এর পাশাপাশি শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ রয়েছে এমন বিশ্বাসও রয়েছে। হাঁপানি, বাতসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ ভালো করার দাবিতে কোথাও কোথাও শিয়াল শিকার ও হত্যার ঘটনাও ঘটে।তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিয়ালের মাংস খেলে এসব রোগ ভালো হয় এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।অর্থাৎ দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।তক্ষককে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর কথিত কোটি টাকার দাম। বিভিন্ন সময়ে ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর মতো দাবিতে তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত বলা হয়েছে।এমনকি এসব গুজবকে কাজে লাগিয়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণ বা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এ ধরনের গুজবের কারণে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে এবং বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় দেশে তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও পাচার ও অবৈধভাবে সংগ্রহের কারণে তক্ষক নিয়ে সংরক্ষণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।জোঁক নিয়ে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে লিচ থেরাপি বা জোঁক দিয়ে চিকিৎসা ব্যবহারের নজির রয়েছে।এ ক্ষেত্রে সব ধরনের জোঁক ব্যবহার করা হয় না। নির্দিষ্ট ধরনের মেডিকেটেড জোঁক ব্যবহার করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে জমে থাকা রক্ত অপসারণে চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন নির্দিষ্ট ধরনের রক্ত জমাট বা অস্ত্রোপচারের পর জটিলতায়, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।তবে বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’ দিয়ে বাত, কোমরব্যথা, যৌন সমস্যা কিংবা নানা রোগ সারানোর দাবি আলাদা বিষয়। এসব দাবির কার্যকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।তাই চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিকেটেড জোঁক এবং বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত জোঁকের তেলকে এক করে দেখা ঠিক নয়।শিয়ালের মাংস বা তক্ষক খাওয়ার ক্ষেত্রে অজানা জীবাণু, পরজীবী বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি থাকতে পারে। একইভাবে অজানা উপাদানযুক্ত তেল বা কথিত ভেষজ পণ্য ব্যবহার করাও ক্ষতির কারণ হতে পারে।আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এসব লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া।বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাণী বা তার দেহের অংশ রোগ সারাতে পারে কি না, তা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ প্রয়োজন।শিয়াল ও তক্ষক শুধু লোকবিশ্বাসের বিষয় নয়, এগুলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬ আইনে খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তক্ষককেও সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় রাখা হয়েছে।আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহণ, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা নিষিদ্ধ।ফলে লোকবিশ্বাসের কারণে এসব প্রাণী শিকার বা বেচাকেনা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, আইনগত সমস্যারও কারণ হতে পারে।কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে প্রচলিত হলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য হয়ে যায় না। শিয়ালের মাংস, তক্ষক কিংবা জোঁকের তেল নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন দাবির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।রোগ সারানোর দাবির আগে প্রমাণ জরুরি। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া কোনো প্রাণী, প্রাণীর দেহাংশ বা অজানা তেলকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রোগ হলে লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

শিয়ালের মাংস, তক্ষক, জোঁকের তেল সত্যিই কি রোগ সারায়?