হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোতে তীব্র আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সাপ্তাহিক মজুরি না পেয়ে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক। এতে কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও চা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণ না পাওয়াকে কোম্পানির আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের সূত্রে জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে মজুরি পাওয়ার কথা থাকলেও এবার তা পাননি তাঁরা। ফলে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় শ্রমিকদের। এর প্রতিবাদে চুনারুঘাটের দেউন্দি ও লালচান্দ এবং মাধবপুরের নোয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত কাজে ফিরতে অনাগ্রহী তাঁরা। শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে চা বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
দেউন্দি টি কোম্পানির অধীনে চারটি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি ও লালচান্দ, মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিঙ্গা চা বাগান উল্লেখযোগ্য। এসব বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের জীবিকা মূলত সাপ্তাহিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যা চলছে। কখনো মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, কখনো আবার অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সংকট দেখা দিচ্ছে। এবার নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পাওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
লালচান্দ চা বাগানের শ্রমিক সভাপতি বিজন বাউরী ও বাগান পঞ্চায়েত নেতা খেলু নায়েক বলেন, কোম্পানির চারটি চা বাগানের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। মালিকপক্ষ নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারছে না। অথচ সাপ্তাহিক মজুরির ওপর নির্ভর করেই তাঁদের সংসার চলে।
তাঁরা বলেন, সপ্তাহ শেষে মজুরি পাওয়ার পর চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে সংসার চালাতে হয়। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচসহ পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনও মেটাতে হয় এই সামান্য আয় দিয়ে। অধিকাংশ শ্রমিকের সঞ্চিত অর্থ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পেলে তাঁদের পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি কমেট নায়েক বলেন, দেউন্দি টি কোম্পানির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের মজুরি কবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পাওনা পরিশোধ না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ায় ২০২২ সাল থেকে দেউন্দি টি কোম্পানি আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যার মুখে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানির অধীন চারটি চা বাগানের উৎপাদন ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রায়।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঋণ অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা ও ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি বাগানসংশ্লিষ্টদের। তবে এখন পর্যন্ত সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
বাগান কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, আর্থিক সংকটের কারণে একসময় বাগানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এতে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা হয়। এর মধ্যে বাগান থেকে একাধিক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও আর্থিক ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে।
বাগান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চায়ের বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। ফলে বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে বাগান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
লালচান্দ চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক হুমায়ুন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় অর্থসংকটের কারণে বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কোম্পানি চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছরই কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু চায়ের বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। এ অবস্থায় বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে বাগান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের পরিবারে যেমন আর্থিক সংকট বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন অব্যাহত রাখা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি হবিগঞ্জের জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং শ্রীমঙ্গলের শ্রম অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, তাঁদের বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে, বাগান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ঋণসহ আর্থিক সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ চায়। দ্রুত সমাধান না হলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোতে তীব্র আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সাপ্তাহিক মজুরি না পেয়ে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক। এতে কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও চা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণ না পাওয়াকে কোম্পানির আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের সূত্রে জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে মজুরি পাওয়ার কথা থাকলেও এবার তা পাননি তাঁরা। ফলে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় শ্রমিকদের। এর প্রতিবাদে চুনারুঘাটের দেউন্দি ও লালচান্দ এবং মাধবপুরের নোয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত কাজে ফিরতে অনাগ্রহী তাঁরা। শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে চা বাগানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
দেউন্দি টি কোম্পানির অধীনে চারটি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি ও লালচান্দ, মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিঙ্গা চা বাগান উল্লেখযোগ্য। এসব বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের জীবিকা মূলত সাপ্তাহিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যা চলছে। কখনো মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, কখনো আবার অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সংকট দেখা দিচ্ছে। এবার নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পাওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
লালচান্দ চা বাগানের শ্রমিক সভাপতি বিজন বাউরী ও বাগান পঞ্চায়েত নেতা খেলু নায়েক বলেন, কোম্পানির চারটি চা বাগানের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। মালিকপক্ষ নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারছে না। অথচ সাপ্তাহিক মজুরির ওপর নির্ভর করেই তাঁদের সংসার চলে।
তাঁরা বলেন, সপ্তাহ শেষে মজুরি পাওয়ার পর চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে সংসার চালাতে হয়। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচসহ পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনও মেটাতে হয় এই সামান্য আয় দিয়ে। অধিকাংশ শ্রমিকের সঞ্চিত অর্থ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পেলে তাঁদের পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি কমেট নায়েক বলেন, দেউন্দি টি কোম্পানির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের মজুরি কবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পাওনা পরিশোধ না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ায় ২০২২ সাল থেকে দেউন্দি টি কোম্পানি আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যার মুখে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানির অধীন চারটি চা বাগানের উৎপাদন ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রায়।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঋণ অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা ও ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি বাগানসংশ্লিষ্টদের। তবে এখন পর্যন্ত সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
বাগান কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, আর্থিক সংকটের কারণে একসময় বাগানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এতে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা হয়। এর মধ্যে বাগান থেকে একাধিক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও আর্থিক ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে।
বাগান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চায়ের বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। ফলে বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে বাগান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
লালচান্দ চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক হুমায়ুন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় অর্থসংকটের কারণে বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কোম্পানি চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছরই কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু চায়ের বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। এ অবস্থায় বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে বাগান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের পরিবারে যেমন আর্থিক সংকট বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন অব্যাহত রাখা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি হবিগঞ্জের জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং শ্রীমঙ্গলের শ্রম অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, তাঁদের বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে, বাগান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ঋণসহ আর্থিক সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ চায়। দ্রুত সমাধান না হলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
